ব্যাংকের টাকায় সৌর সেচপাম্প নিয়ে বিপাকে পঞ্চগড়ের কৃষকরা

প্রকাশ : ১৪ মে ২০১৮, ০০:০০

হায়দার আলী, পঞ্চগড়

পঞ্চগড়ে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছেন কৃষকরা। প্যানেল স্থাপনের দু-এক বছরের মাথায় অকেজো হয়ে পাম্প বন্ধ থাকলেও ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ছে চক্রবৃদ্ধি হারে। ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকার মূল ঋণ এখন সুদাসলে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা। পাম্প বন্ধ থাকায় কৃষক সমবায় সমিতির সদস্যরা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না।

কৃষকদের দাবি, ১০ বছরের জন্য এ সেচ পাম্প বসানো হলেও এখানে নিম্নমানের প্যানেল ও যন্ত্রাংশ দেওয়ায় স্থাপনের ২-৩ বছরের মধ্যে অকেজো হয়ে পড়ে আছে সেচ পাম্প। সেচকার্য চালাতে তারা প্যানেলের পাশেই গভীর নলকূপ স্থাপন করে তাদের জমিতে চাষাবাদ করছেন।

সরেজমিন জানা গেছে, কৃষকদের কৃষিকাজে সহায়তা করার জন্য মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের দুজন কর্মকর্তা ইকবাল ও কিবরিয়া পঞ্চগড়ে এসে পরিবেশবান্ধব এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এজন্য তারা ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়ার বিষয়টিও কৃষকদের নিশ্চিত করেন। তাদের কথামতো পঞ্চগড় জেলায় ১৪টি কৃষক সমবায় সমিতি গঠন করা হয়। এসব সমিতিতে ১৭টি সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প বসানোর জন্য ব্যাংকের ঠাকুরগাঁও শাখার মাধ্যমে গ্রিন এনার্জি (এগ্রিকালচার বেসড ঋণ) প্রকল্পের আওতায় কৃষক সমবায় সমিতিগুলোর সদস্যদের জমি বন্ধক রেখে ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা ঋণ বরাদ্দ করা হয়। সেই ঋণের টাকা দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ১৭টি সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্পের জন্য প্রয়োজনীয় প্যানেল ও যন্ত্রাংশ স্থাপন করা হয়। নির্মাণ করা হয় প্রয়োজনীয় ড্রেন। প্যানেল স্থাপনের প্রথম বছর ভালো সার্ভিস দিলেও পরবর্তী বছর থেকেই সমস্যা শুরু হয়। সারাদিন সূর্যের আলো থাকলেও পাম্পে পানি ওঠা কমতে থাকে। ওই পানি দিয়ে ৮-১০ বিঘা জমিতে সেচকার্য চালানো যায়। এভাবে দুই বছর চলার পর দেখা যায় পাম্প চালুই হচ্ছে না। অকেজো হয়ে আছে। এ নিয়ে মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ও প্যানেল স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান গ্রিন টেক লিমিটেডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বার বার যোগাযোগ করেও তারা কোনো ফল পায়নি। বাধ্য হয়ে তারা তাদের সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প ফিরিয়ে নিয়ে ঋণ থেকে মুক্তি পেতে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আবেদন করেছে।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের সিংরোড রতনীবাড়ী কৃষক সমবায় সমিতির সভাপতি মো. রাশেদুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ২০১৪ সালের ৩০ জুনের মধ্যে আমরা ১১৩ বিঘা জমির কাগজপত্র ব্যাংকের ঠাকুরগাঁও শাখায় দিলে পরের বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে নির্বাচিত ঠিকাদার প্যানেল স্থাপন করে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প স্থাপনসহ ড্রেন নির্মাণ করে দেন। এজন্য আমাদের নামে ২৪ লাখ টাকা ঋণ দেখানো হয়। আমরা সেই ঋণের টাকা চোখেও দেখিনি। তারা আমাদের জানায়, এ পাম্প দিয়ে ১০ বছর পর্যন্ত ৮০-১০০ বিঘা জমিতে সেচ দিয়ে চাষাবাদ করা যাবে। আর সেচের আয় দিয়ে সুদসহ ঋণের কিস্তি দেওয়া হবে। কিন্তু প্রথম বছর ভালোভাবে সেচকার্য চালানো হলেও পরের বছর থেকেই সমস্যা শুরু হয়। ধীরে ধীরে পাম্প দিয়ে পানি ওঠা কমতে থাকে। গত বোরো মৌসুমে এ পাম্প দিয়ে মাত্র ৮-৯ বিঘা জমি চাষ করতে পেরেছিলাম। আর চলতি বোরো মৌসুমে পাম্প চালু করতে গিয়ে দেখি তা অকেজো হয়ে আছে। পাম্প চালুই হচ্ছে না।

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার বেংহারী বনগ্রাম ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য আমিরুল ইসলাম জানান, আমরা ট্রাস্ট ব্যাংক ও সোলার স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান সেরপা কোম্পানির সঙ্গে বহুবার যোগাযোগ করেও তারা আমাদের কোনো কথাই শুনছে না। পাম্প দিয়ে কোনো সেচকার্য করতে না পারায় আমাদের কোনো আয় হচ্ছে না। তাই আমরা ঋণের কিস্তিও দিতে পারছি না। তিনি বলেন, যে প্যানেল ও যন্ত্রপাতি দিয়ে আমাদের পাম্প দেওয়া হয়েছে, তা বাজার মূল্যে ৩০ লাখ টাকার ওপর হবে না। অথচ আমাদের নামে ৭০ লাখ টাকা ঋণ দেখানো হয়েছে। ব্যাংকের কর্মকর্তা ইকবাল সাহেব ও তৎকালীন ঠাকুরগাঁও শাখার ব্যবস্থাপক কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশ করে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্পের ঋণ দেওয়ার নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এখন ইকবাল সাহেবকে মোবাইলে ফোন দিলে তিনি ফোনও রিসিভ করছেন না। আমরা এখন কীভাবে এ ঋণ পরিশোধ করব।

এ নিয়ে কথা বললে মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ঠাকুরগাঁও শাখার ব্যবস্থাপক এনামুল হক বলেন, এ ঋণটি দেওয়া শুরু হয়েছিল ২০১২-১৩ সাল থেকে। ইতোমধ্যে ৫-৬ বছর চলে গেছে। সমস্যা হলে শুরু থেকেই হওয়ার কথা ছিল। তারা তো আমাদের জানায়নি। আর ব্যাংক ঋণ দিয়ে যদি কোনো গুডস কিনে দেয়, তা ৫ বছর পর ফেরত নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা যে চিঠি দিয়েছে তা আমি হেড অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছি, তাদের গাইডেন্স জানার জন্য। হেড অফিস আমাকে যেভাবে নির্দেশনা দেবে আমি সেভাবে ব্যবস্থা নেব।

এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ইকবালের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

"