পিয়াইন এখন মৃতপ্রায় বাঁচাতে নেই উদ্যোগ

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

এম এ রউফ, সিলেট

পিয়াইন নদী এখন মৃতপ্রায়। উৎসমুখ ভরাট আর পরিবেশ ধ্বংস করে অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলনের ফলে পিয়াইন নদী পরিণত হয়েছে ধু ধু বালু চরে। দীর্ঘ সময় ধরে এ অবস্থা বিরাজ করলেও নদীকে বাঁচাতে নেই কোন উদ্যোগ।

পিয়াইন নদী বাংলাদেশে এমনকি বিদেশেও ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে এটির গুরুত্ব অনেক বেশি। মূলত; পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপই জাফলংকে আরও আকর্ষণীয় করেছে। পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেল পানি, উঁচু পাহাড়ে গহিন অরণ্য ও শুনশান নীরবতার কারণে এলাকাটি পর্যটকদের দারুণভাবে মোহাবিষ্ট করে। কিন্তু উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানির সাথে পলি মাটি আসায় নদীটি এখন ভরাট হয়ে গেছে। স্বাধীনতার আগে এমনকি পরেও পিয়াইন নদী নিয়ে নানা পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ অর্ধশত বছরেও আলোর মুখ দেখেনি সিলেটের পিয়াইন নদী প্রকল্প।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ভারতের ওম নদী বাংলাদেশের সিলেট জেলার গোয়াইনঘাটের জাফলংয়ে প্রবেশ করে দুটি শাখায় প্রবাহিত হয়েছে। নদীটির একটি শাখা ডাউকি নাম ধারণ করে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে গোয়াইনঘাটের পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের মুখতলা এলাকায় সারি নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। অপর শাখাটি পিয়াইন নামে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর সাথে মিশেছে।

পিয়াইন নদী ছিল খর¯্রােতা। জাফলংয়ে এসে পর্যটকরা নদীটির স্বচ্ছ জলে নেমে জলকেলিতে মেতে ওঠতেন। নৌকা দিয়ে নদীতে ঘুরতে ঘুরতে আয়নার মতো স্বচ্ছ জলের নিচে ঝাঁকে ঝাঁকে ভেসে চলা মাছ দেখে অন্যরকম এক আনন্দে ডুবে যেতেন পর্যটকরা। নির্মল প্রকৃতির মধ্যে থাকা অপরূপ পিয়াইন নদীর বুকে অসংখ্য চলচ্চিত্রেরও শ্যুটিং হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে পিয়াইন নদী পড়েছে অস্তিত্ব সংকটে।

আরো জানা যায়, নদীটির উৎসমুখ ভরাট হয়ে যাওয়ায় এর বুকে নেই জলের প্রবাহ। এছাড়া জাফলংয়ে অপরিকল্পিতভাবে পরিবেশ বিধ্বংশী বোমা মেশিন ও এক্সাভেটর দিয়ে পাথর উত্তোলন করার ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পিয়াইন নদীতে। বালুর স্তূপ জমে নদীর বুকে পড়েছে চর। বর্ষাকালে নদীতে যৎসামান্য পানি প্রবাহ থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে একেবারে বালুচরে পরিণত হয় পিয়াইন নদী।

স্থানীয় সংগ্রামপুঞ্জির বাসিন্দা কেনাং মিচাং বলেন, ‘বহু বছর আগে পিয়াইন নদীতে ছিল ভরা যৌবন। নদীর বুক চিরে স্বচ্ছ জলের ধারা বয়ে যেত। দেশ-বিদেশের পর্যটকরা পিয়াইনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতেন। পিয়াইন নদীর পানি নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করতেন আশপাশের বাসিন্দারা। এখানে চলচ্চিত্রের শ্যুটিং হতেও দেখেছি আমরা। কিন্তু এখন সবই যেন স্মৃতি। পিয়াইন মরে যাচ্ছে। নদীটি বাঁচাতে কারো কোনো তৎপরতাও নেই।’

বাংলাদেশ পরিবশে আন্দোলন (বাপা) সিলেটে জেলার সদস্য আবদুল হাই বলেন, ‘একদিকে উৎসমুখ ভরাট হয়ে যাওয়া, অন্যদিকে অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলন। ফলে পিয়াইন নদী মৃতপ্রায়। একটি নদী মরে যাওয়া মানে প্রাণ ও পরিবেশের উপর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়া। পিয়াইনকে রক্ষা করতে খনন কাজসহ নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’

সিলেটে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ভারতের ওম নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে পিয়াইন ও ডাউকি নাম ধারণ করেছে। ১৯৮৮ সালে এক ভূমিকম্পে পিয়াইন নদীর উৎসমুখ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে পিয়াইন নদীতে পানির প্রবাহ কমতে থাকে। পিয়াইন নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে ডাউকি নদীতে পানির চাপ বেশি থাকে। এতে ওই নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন দেখা দেয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘পিয়াইন নদীর উৎসমুখ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় পড়েছে। এজন্য উৎসমুখ খনন করতে হলে যৌথ নদী কমিশন গঠন করতে হবে।’ পিয়াইন নদী খনন এবং উৎস মুখে বাঁধ নির্মাণ করে স্বাভাবিক নিয়মে পানি পিয়াইন ও জাফলং নদী দিয়ে সমানভাবে যাতে প্রবাহিত হয় তার ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান এলাকাবাসী।

"