মুজিবনগর দিবস আজ

অবহেলায় পড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

মাহাবুব চান্দু, মেহেরপুর

দুই দশকেও শেষ হয়নি মেহেরপুরের মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের কাজ। যেটুকু কাজ হয়েছে, তা-ও লোকবল ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে।

গতকাল সোমবার সরেজমিনে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র প্রকল্প ঘুরে জানা গেছে, ১৯৯৮ সাল থেকে ৮০ একর জমি অধিগ্রহণ করে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মেহেরপুরের তৎকালীন বৈদ্যনাথতলায় (মুজিবনগর) নির্মাণ করা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র। নতুন করে ২৬ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক বাংলাদেশের মানচিত্র নির্মাণকাজ সাত বছর আগে শেষ হয়ে গেলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়নি। মানচিত্রে পুরো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন চিত্র ফুটে উঠলেও মুজিবগরের শপথ নেওয়ার কোনো চিত্র সেখানে স্থান পায়নি। সেখানে নির্মিত বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণের ভাস্কর্যসহ অন্যান্য ভাস্কর্যগুলো এতটাই নিম্নমানের, যা মাঝে মধ্যেই ভেঙে পড়ে। অনেকগুলোর ভেতরের রডের বদলে চিকন তার দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে শিলাবৃষ্টি বা ঝড় হলে সেগুলো ভেঙে যায়। কয়েক দফা সেগুলো রিপেয়ারিং করাও হয়েছে।

আরো দেখা যায়, ভাস্কর্যগুলোকে রিপেয়ারিং করে পালিশ করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ভাস্কর্য, এক পাক সেনার ডান হাতে থাকা মশালটি ভেঙে পড়েছে অনেক আগে। অথচ, নতুন করে আর তৈরি করা হয়নি। ফলে মূল নকশা বিকৃত আকারে প্রকাশ পাচ্ছে। মেহেরপুরের স্থানীয় ১২ আনসার সদস্য বাংলাদেশের প্রথম সরকারের নেতৃবৃন্দকে গার্ড অব অনার প্রদান করেছিলেন। অথচ, ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে আটজন আনসার সদস্যের।

এ ছাড়াও ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞ, পাকবাহিনীর হাতে নারী নির্যাতন, মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে অগ্নি সংযোগ, সিলেটে ১১ জন সেক্টর কমান্ডারদের গোপন বৈঠক, পাক বাহিনীর আত্মসর্মপণ নিয়ে নির্মিত ভাস্কর্যগুলো বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। এ ছাড়াও মানচিত্রের পূর্বদিকের গ্যালারির দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। আম্রকাননের অনেকগুলো গাছ পরিচর্যার অভাবে মারা গেছে। এর স্থলে নতুন কোনো গাছ রোপন করাও হয়নি।

মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কমপ্লেক্সটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তাসহ প্রায় ৪০ জন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ, এখনো তাদের পদায়ন করা হয়নি। এ ছাড়া সন্ধ্যার পরে ঠিকমত আলো জ্বলে না। যে কারণে সন্ধ্যার স্মৃতিকেন্দ্র পুরো অরক্ষিত থেকে যায়। এ ব্যাপারে মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোকতার হোসেন দেওয়ান প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, এবার ১৭ এপ্রিলকে ঘিরে ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ভাস্কর্যসহ মানচিত্র, স্মৃতিসৌধসহ অধিকাংশ স্থাপনাগুলো রিপেয়ারিং ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। স্ট্রিট লাইট, মানচিত্রে লাইটসহ সংস্কার করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ১১টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে গড়ে উঠছে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র। এর মধ্যে এখনো প্রশাসনিক প্লাজা, অ্যাপ্রোচ রোড, বিদ্যুৎ, জেনারেটর ক্রয়, মানচিত্রে স্টেজে কাঠের কাজ, সিঁড়িতে এসএস রেলিং, জলছাদ র‌্যাম্প ও এসপিএমসিবি পাওয়ার সকেট, আন্ডার গ্রাউন্ড সার্ভিস লাইন কাজ আজও শেষ হয়নি।

মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহ বলেন, স্মৃতিকেন্দ্রের কাজটি প্রকল্পভুক্ত কাজ। এখনো বেশ কিছু কাজ বাকি রয়েছে। মাঝে মাঝেই মন্ত্রণালয়কে কাজ শেষ করার ব্যাপারে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এই কমপ্লেক্সে যে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের এখানে পদায়ন করলে অন্তত স্থাপনাগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা সুবিধা হতো। মেহেরপুর-১ (সদর ও মুজিবনগর) আসনের সংসদ সদস্য ফরহাদ হোসেন বলেন, ১৯৯৮ সালে এই প্রকল্পের নকশা তৈরি ও অনুমোদন হয়। জোট সরকার সেই নকশা থেকে মুক্তিযুদ্ধের অনেক ইতিহাস বাদ দেয়। সেজন্য নতুন করে ১৯৯৮ সালে প্রকল্প দেওয়া হয়েছে। যেগুলো বাদ পড়েছে সেগুলো সংযোজন হবে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার জন্য গণপূর্ত বিভাগ স্কেচ তৈরি করছে। মেহেরপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আবদুস সালাম বাঁধন বলেন, শুধু মুজিবনগর দিবস এলেই এটিকে পরিচর্যা করা হয়। শুধু এই দিবসেই নয়, বছরের সবসময় এটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং ১৭ এপ্রিলকে জাতীয় শপথ দিবস ও সরকারি ছুটি ঘোষণার দাবি জানাই।

মুজিবনগরে আসছেন ডজনখানেক মন্ত্রী-এমপি : ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ডজনখানেক মন্ত্রী-এমপি মেহেরপুরে আসছেন। দিবসটি উপলক্ষে সূর্যোদয়ের সঙ্গে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, পুষ্পস্তবক অর্পণ, গার্ড অব অনার প্রদান ও কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হবে। পরে আনসার ও ভিডিপির আয়োজনে ‘হে তারুণ্য তুমি দাঁড়াও’ শীর্ষক উপস্থাপনা ও মুজিবগনগর আম্রকাননের শেখ হাসিনা মঞ্চে আলোচনা সভা হবে।

মুজিবনগর দিবস উদ্যাপন কমিটির আহ্বায়ক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিবেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়কমন্ত্রী এ কে এম মোজাম্মেল হক, যুগ্ম সম্পাদক আবদুর রহমান, খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদ আল স্বপন, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন। এ ছাড়াও বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপি এবং মেহেরপুরসহ আশেপাশের জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন।

 

"