নানা সংকটে কক্সবাজারের ৪০ হাজার লবণ চাষি

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

রেজাউল করিম রেজা, পেকুয়া (কক্সবাজার)

প্রচণ্ড গরম ও রোদে পুড়ে লবণ উৎপাদন করলেও নায্য মূল্য, ব্যাংক ঋণ না পাওয়া ও বিদেশ থেকে লবণ আমদানির কারণে সংকটের আবর্তে কক্সবাজারের ৪০ হাজার চাষি। লবণ শিল্প বাঁচাও সমিতির অভিযোগ, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর ও খুলনার মিল মালিকরা প্রায় অর্ধলক্ষ লবণ চাষিদের ভাগ্য নিয়ে খেলায় মেতেছে।

সমিতির সভাপতি রহিম উল্লাহ বলেন, মাঠ পর্যায়ে চাষিরা ৪৫ কেজি লবণ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২৫০ টাকা। সে হিসেবে প্রতি কেজির মূল্য দাঁড়ায় মাত্র সাড়ে ৫ টাকা। অথচ কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকায় উৎপাদিত লবণ ক্রয় করে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো প্রতি কেজি প্যাকেটজাত লবণ বিক্রি করছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা।

রহিম উল্লাহ আরো বলেন, প্রকৃতির বৈরী আচরণের কারণে গেল বছর লবণ উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হয়নি। সে অজুহাত দেখিয়ে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করেছে নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর ও খুলনার বেশির ভাগ মিল মালিকরা, অন্যদিকে তাদের গুদামে এসব বিদেশি লবণ এখনো মজুদ আছে। ফলে দেশে উৎপাদিত লবণ কিনতে তারা তেমন একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এছাড়াও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো আয়োডিন মিশ্রিত লবণের নাম দিয়ে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য করছেন, অথচ সরাসরি লবণ উৎপাদন কাজে জড়িত চাষিদের পেটে ঠিকমত দুই বেলা ভাতও জোটছে না।

শিল্প বাঁচাও সমিতির এ নেতার অভিযোগ, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এসব প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো শত শত কোটি টাকার ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে গেলেও লবণ চাষিরা কোন ধরণের ব্যাংক ঋণ পায় না বললেই চলে। আবার যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় তবে, ওইসব প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো লবণ উৎপাদনের ঘাটতি দেখিয়ে বিদেশ থেকে লবণ আমদানির তোড়জোড় শুরু করবে।

কক্সবাজার বিসিক থেকে জানা গেছে, কক্সবাজারে মোট ৬৯ হাজার ৪১৫ একর জমিতে ৪০ হাজার চাষি চলতি মৌসুমে লবণ চাষ করেছে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে লবণ উৎপাদন শুরু হয়েছে। দেশের এক তৃতীয়াংশ লবণের চাহিদা পূরণ করে চকরিয়া তথা কক্সবাজারের উৎপাদিত লবণ। আবহাওয়া ভালো থাকায় চলতি মৌসুমে প্রচুর পরিমাণ লবণ উৎপাদন হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে মজুদ রয়েছে বিপুল পরিমাণ লবণ। তবে এবার লবণের মূল্য কম থাকায় চাষিদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে।

সরজেমিন জানা গেছে, প্রান্তিক চাষিরা প্রতি কানি লবণ মাঠ বর্গা নিয়েছেন ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকায়। তার ওপর রয়েছে শ্রমিকের বেতন, পলিথিন ক্রয়সহ আনুসাঙ্গিক ২০ হাজার টাকা খরচ। গত বছরের এই সময়ে প্রতি মণ লবণের মূল্য ছিল সাড়ে ৪শ থেকে ৫শ টাকা। কিন্তু মৌসুমে শুরুতেই লবণের দাম ৩৫০ টাকা থাকলেও বর্তমানে প্রতি মণ লবণের দাম ২৩০ টাকা ২৪০ টাকা।

লবণচাষি সকিল সাজ্জাদ জানান, গত বছর প্রতি মণ লবণ বিক্রি হয়েছিল ৫শ থেকে সাড়ে ৫শ টাকায়। এ মৌসুমে শুরুতে মণ প্রতি লবণের দাম ছিল ৩৫০ টাকা, এখন তা ২২০ টাকায় নেমেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা ও আমদানির গুজব ছড়িয়ে চাষি পর্যায়ে লবণের দাম কমিয়ে দিয়েছে একটি মহল।

মুন্না মিয়া নামে আরেক চাষি বলেন, গত বছরের তুলনায় এই মৌসুমে লবণের দাম অনেক কম। প্রতিবছর ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা লাভ থাকে, আর এ মৌসুমে লাভ তো দূরের কথা মূলধনের নিশ্চয়তা নাই। বর্তমান বাজারদরে লবণ বিক্রি করে দিতে পারছি না শ্রমিকের বেতন, চালাতে পারছি না ঘর-সংসার, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনা।

উপকূলীয় লবণ চাষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসাইন মাসুম বলেন, দেশের একমাত্র স্বয়ং সম্পুর্ণ খাতটি ধবংস করার জন্য কতিপয় মিল মালিক ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। তারা বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করে দেশের এই প্রধান উৎপাদন খাতটিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার যড়যন্ত্র চালাচ্ছে।

কক্সবাজার বিসিক কর্মকর্তা মো. শামীম আলম জানান, চলতি মৌসুমে মাঠ পর্যায়ে লবণের দাম সন্তোষজনক না থাকায় চাষিদের মাঝে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

 

"