ইউএনওর বিরুদ্ধে গ্রামপুলিশের বেতন লোপাটের অভিযোগ

১৬ নভেম্বর সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রকৌশলীর কাছে ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৩০০ টাকার একটি চেক পাঠিয়ে দিয়ে তা ‘সুরাহা’ করতে বলেন

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

আকরামুল ইসলাম, সাতক্ষীরা

সাতক্ষীরার তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ‘নিয়ম বর্হিভূতভাবে একক কর্তৃত্বে’ সরকারি একাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলনের ফলে পাঁচ মাস ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না উপজেলা শতাধিক গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) ও দফাদার। এ নিয়ে উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে সৃষ্ট দ্বন্দ্বে স্থবির হয়ে পড়েছে উন্নয়ন কাজ। আর উপজেলার ১০৮ চৌকিদার ও ১২ দফাদার গত পাঁচ মাস যাবৎ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রাপ্ত বেতন ও সাত মাস যাবৎ থানা থেকে যাতায়াত ভাতা না পেয়ে বেতন-ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এর প্রতিকার চেয়ে গত রোববার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করে লিখিত অভিযোগও জানিয়েছেন গ্রাম পুলিশরা।

আলী গাজী, জালালউদ্দিন, কোমল দে, মনোরঞ্জন দত্তসহ কয়েকজন গ্রাম পুলিশ জানান, চৌকিদাররা প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা বেতন পেয়ে থাকেন। এর অর্ধেক টাকা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে পেয়ে থাকেন। বাকী অর্ধেক আসে সরকারের রাজস্ব তহবিল (মাদার একাউন্ট) থেকে। সরকারি বিধান অনুযায়ী, দেশের স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করের এক শতাংশ জমা হয় এই রাজস্ব সংক্রান্ত ব্যাংক হিসাব নম্বরে। এই একাউন্ট থেকে টাকা তোলার জটিলতায় ইউএনও এবং উপজেলা প্রকৌশলীর মধ্যে বিরোধকে কেন্দ্র করে উপজেলার চৌকিদার-দফাদাররা গত অক্টোবর ’১৭ থেকে ফেব্রুয়ারি ’১৮ পর্যন্ত অর্ধেক বেতন পাননি। একই কারণে থানা হাজিরা বাবদ সাপ্তাহিক ৩০০ টাকা গত বছরের আগস্ট থেকে পাচ্ছেন না। সব মিলিয়ে তাদের বকেয়া ১৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২০০৫ ও ২০১১ পরিপত্রে প্রাপ্য রাজস্ব ব্যায় সংক্রান্ত নির্দেশিকায় অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর কর সংক্রান্ত হিসাব (মাদার একাউন্ট) ইউএনও এবং উপজেলা প্রকৌশলীর যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হবে। আর এই একাউন্ট থেকে সর্বপ্রথম গ্রাম পুলিশ ও দফাদারের বেতন পরিশোধ করা হবে। আর এই চেক বই ইউএনও অফিসে জমা থাকবে। পরিপত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী, তালা উপজেলায় ২০০৫ সাল থেকে ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল সোনালী ব্যাংকে কার্যক্রম চলে এসেছে। ওই সময় ইউএনও মাহাবুবর রহমান বদলীতে হিসেবে মো. ফরিদ হোসেন যোগদান করে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের জুলাই মাসে তালা উপজেলা প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) কাজী আবু সাঈদ মো. জসীম জানতে পারেন, ইউএনও একক স্বাক্ষরের মাধ্যমে ‘মাদার একাউন্ট’ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা তোলা হয়েছে। এ কারণে গত বছরের ৩০ জুলাই তিনি ব্যাংকের ব্যবস্থাপকের কাছে স্টেটমেন্ট চেয়ে পাঠান। ওই দিন স্টেটমেন্ট পাওয়ার পরদিন টাকা হস্তান্তরের ব্যাপারে আরো একটি চিঠি দেন। পহেলা আগস্ট তিনি ইউএনও বরাবর টাকা স্থানান্তরের ব্যাপারে চিঠি দেন। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোন জবাব না দেওয়ায় ১৭ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের ডিজিএমকে একটি চিঠি দিলে তিনি তথ্য দেওয়ার নির্দেশ দেন। এছাড়া ১৬ আগস্ট ‘যৌথ হিসাব’ কিভাবে ‘একক হিসাব’ রূপান্তরিত হলোÑজানতে চেয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপকে চিঠি দেন তিনি। এদিকে, কয়েকটি চিঠি দেওয়ার পর গত ৯ নভেম্বর ইউএনও একটি ‘অলিখিত’ (ব্লাঙ্ক) একাউন্ট ফর্মে যৌথ একাউন্ট পরিচালনার জন্য প্রকৌশলীকে নমুনা সাক্ষর করতে বললে তিনি তা করেননি। অপর দিকে, ১৬ নভেম্বর সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তার কাছে ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৩০০ টাকার একটি চেক পাঠিয়ে দিয়ে তা ‘সুরাহা’ করতে বলেন। হিসাবটি কিভাবে পরিচালিত হবে তার রূপরেখা না পাওয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই চেকটি গত ১৬ জানুয়ারি ইউএনও অফিসে ফেরৎ দেন।

তালা উপজেলা প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) কাজী আবু সাঈদ মো. জসীম জানান, সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী না হওয়ায় ইউএনও’র একক সাক্ষরে টাকা স্থানান্তরের বিষয়ে খুলনা বিভাগীয় মুখ্য প্রকৌশলী আফজাল হোসেনকে অবহিত করেছেন। একইভাবে ‘প্রতিকার চেয়ে’ ৯ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ বিভিন্ন ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়েছেন। তিনি জানান, এ সংক্রান্ত তদন্তের অংশ হিসেবে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আব্দুল হান্নান ডেকে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইউএনও নিয়ম বহির্ভূতভাবে টাকা স্থানান্তরের জবাবদিহিতা করতে না পেরে নতুন করে জয়েন্ট একাউন্টের মাধ্যেমে তাকে ‘ফাঁসাতে’ চাইছেন।

তবে তালা উপজেলার একাধিক জন প্রতিনিধি নাম না প্রকাশের শর্তে অভিযোগ করেন, ‘নিজের কাছের লোক’ বলে পরিচিত এমন ৫-৬ ইউপি চেয়ারম্যানদের নামে ইউএনও চেক দিয়ে ১ কোটি ৭ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন। এ চেক দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন রেজুলেশন, স্টেটমেন্ট বা প্রকল্প বাস্তবায়নের চিঠি নেই। যার অধিকাংশ টাকাই লুটপাট হয়েছে বলে তাদের ধারণা।

সোনালী ব্যাংকের বর্তমান তালা শাখার ব্যবস্থাপক ভবেশ চন্দ্র মৃধা জানান, এলজিইডি বিভাগের স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর কর সংক্রান্ত পরিপত্র সম্পর্কে তার সঠিক ধারণা ছিল না। বিষয়টি নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৩০০ টাকার চেকটি ফেরৎ দেওয়া হয়েছে। যদিও একক স্বাক্ষরে টাকা তোলার কাজটি তার আগের ব্যবস্থাপক আনছার আলীর আমলে শুরু হয়েছিল। তবে ব্যবস্থাপক আনছারের ফোন নাম্বার চেয়েও পাওয়া যায়নি এই কর্মকর্তার কাছে।

টাকা লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করে তালা ইউএনও মো. ফরিদ হোসেন জানান, তিনি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাওয়া বেতনের অর্ধেকাংশ ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম কার্ডের মাধ্যমে গ্রাম পুলিশ-দফাদারদের বেতন দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তাতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতো না। একক স্বাক্ষরে টাকা উত্তোলনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরিপত্রে ইউএনও এবং উপজেলা প্রকৌশলীর যৌথ স্বাক্ষরে টাকা তোলার কথা বলা থাকলেও একক স্বাক্ষরে টাকা তোলা যাবে না এমনটি লেখা নেই। উপরুন্ত তিনি অভিযোগ করে বলেন, উপজেলা প্রকৌশলী বিনা ভাড়ায় সরকারি কোয়ার্টার ব্যবহার করার বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করা বা তার বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট কেস করার ব্যাপারে সতর্ক করলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে নতুন হিসাব কার্ডে নমুনা স্বাক্ষর করছেন না।

তবে ইউএনও অভিযোগ খ-ন করে প্রকৌশলী কাজী আবু সাঈদ বলেন, তিনি সরকারি কোনো বাসভবনে থাকেন না। সরকারের যে বাসভবন আছে তা ২০১২ সাল থেকে পরিত্যাক্ত। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মো. ইফতেখার হোসেন জানান, গ্রাম পুলিশদের বেতন ভাতা পরিশোধের বিষয়টি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সমাধান করা হবে।

"