সিন্ডিকেটের কবলে সুবর্ণচরের সয়াবিন

সরকারিভাবে সয়াবিনের বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করা হলে প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে কৃষকরা মনে করেন

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

জুয়েল রানা লিটন, নোয়াখালী

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে বিস্তীর্ণ এলাকায় শীতে সূর্যমুখী, সয়াবিন এবং বিভিন্ন ডালসহ রবিশস্য চাষ করা হয়। সয়াবিনের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাষের উপযোগী জমি খুঁজে বের করছে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। মুনাফা ভালো পাওয়ায় কয়েক বছর ধরেই কৃষকরা সয়াবিন চাষে ঝুঁকছেন। তবে সম্প্রতি সয়াবিনের দাম কমতে থাকায় কৃষকরা সয়াবিন নিয়ে উদ্বিগ্ন। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

চরাঞ্চলে আমন ধান কাটার পর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে রবি মৌসুম শুরু হয়। রবি মৌসুমে এ অঞ্চলের কৃষকরা সয়াবিন, চীনাবাদাম, সূর্যমুখী, খেসারি ও মুগ ডালসহ বিভিন্ন প্রকার তেল ও ডালজাতীয় শস্য আবাদ করেন। এই ফসল মে মাসে ঘরে তোলা শুরু করেন কৃষক। আর এই সময়েই কলকাঠি নাড়তে শুরু করে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা।

উপজেলার চর জুবলী ইউনিয়নের কৃষক হানিফ জানান, ফসল তোলার সময় স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট রীতিমতো জিম্মি করে ফেলে কৃষকদের। ওই সিন্ডিকেটের মজুতদাররা সয়াবিনের দাম কমিয়ে দেন বলে জানান তিনি। সয়াবিন চাষী সাহাবউদ্দিন জানান, গত বছর ৭ একর জমিতে তিনি সয়াবিন আবাদ করে প্রায় ২৭০ মণ ফলন পেয়েছেন। এতে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয় এবং বিক্রি করেছেন প্রতি মণ ১ হাজার ১০০ টাকা দরে। তবে ফসল কয়েক দিন ঘরে রাখতে পারলে প্রতিমণ ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকায় বিক্রি করতে পারতেন। কিন্তু চাষের সময় যে টাকা ধার করেছিলেন, তা শোধ করার চাপ থাকায় ফসল দ্রুত বিক্রি করতে হয়। সরকারিভাবে সয়াবিনের বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করা হলে কৃষকদের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে কৃষকরা মনে করেন। একই সঙ্গে সরকারিভাবে সার ও বীজ সরবরাহেরও দাবি জানান তারা।

শুধু কৃষক নয়, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও। তারা বলেন, সুবর্ণচর এলাকার কিছু বড় ব্যবসায়ী ছাড়াও নোয়াখালীর চৌমহনী ও লক্ষ্মীপুর থেকে আসা কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। ফসল তোলার সময় হলে ওই সিন্ডিকেট স্থানীয় বাজারে সয়াবিনের দাম কমিয়ে দেয়। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রফিক উল্যাহ বলেন, ‘সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে আমরা তখন বেশি দামে স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে সয়াবিন কিনতে পারি না। এই সিন্ডিকেট বড় ব্যবসায়ীদের দেশের বাইরে থেকে বেশি দামে সয়াবিন আমদানিতে উদ্বুদ্ধ করে।’

সয়াবিন আমদানিকারক দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। গত অর্থবছরে ৭ লাখ ৫০ হাজার টন সয়াবিন আমদানি করা হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেশি। আমদানি বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ কৃষকদের আগ্রহ কমে যাওয়া, যার নেপথ্যে ওই সিন্ডিকেটকে দায়ী করা হচ্ছে। সুবর্ণচরের চারজন, চৌমহনীর একজন ও লক্ষ্মীপুরের দুই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ করেছেন কৃষক ও ক্ষদ্র ব্যবসায়ীরা।

তবে সুবর্ণচর উপজেলার সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নূর রহমান সিন্ডিকেট সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে জানান। তিনি বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষতি হওয়ায় কৃষকরা এবার সয়াবিন চাষে কিছুটা অনীহা দেখিয়েছিলেন। এ অবস্থায় তাদের সয়াবিন চাষে উৎসাহী করতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। গত বছর সুবর্ণচর উপজেলায় ৯ হাজার ৫০০ একর জমিতে সয়াবিন চাষ হয়েছে। এই বছরও একই পরিমাণ জমিতে সয়াবিন চাষের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

"