কল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে হুমকিতে শীতলক্ষ্যার অস্তিত্ব

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

আব্দুল আলীম, নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জ ‘প্রাচ্যের ড্যান্ডি’ খ্যাত হওয়ার পেছনের গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো মধ্যে শিল্প কারখানা, কৃষি পণ্য আর নদী যোগাযোগই প্রধান। সে সময়ের শিল্পকারখানা পরিবেশ বান্ধব হলেও বর্তমান কারখানাগুলো হয়ে উঠেছে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যের দূষণে শহরের বুক চিরে যাওয়া শীতলক্ষ্যা এখন অস্তিত্বের সংকটে। মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে নদীটির পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য।

এদিকে শীতলক্ষ্যাকে বাঁচিয়ে রাখা যাদের দায়িত্ব, তাদের অনেকেরই নেই তেমন কোন পদক্ষপ। উল্টো নদীতে (ইটিপি) ব্যবহার না করে সরাসরি বর্জ্য ফেলছে এমন কল-কারখানা নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) আওতাধীন হাজার খানেক। শুধু নাসিক নয়, উভয় তীরে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার অবৈধ স্থাপনা ও হাজার খানেক কল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যরে কারণে এক সময়ের ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল চালিকা শক্তি শীতলক্ষ্যার পানি এখন নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে বিষ।

দীর্ঘদিন ধরে নদীর দুই তীরে অবস্থিত শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে শীতলক্ষ্যার পানি দূষিত হয়ে লাল ও কালচে বর্ণ ধারণ করেছে। ফলে বিপন্ন হয়ে পড়েছে নদীতে জীব বৈচিত্র্যের অস্তিত্ব। নদী দুইপাড়ের কৃষি ফসল বা নদীর মাছের প্রাচুর্য হারিয়ে গেছে এমন নয়; তবে অব্যাহত দখল ও বিষাক্ত বর্জ্যে দূষণের ফলে শীতলক্ষ্যার পাড়ের বেকার হয়ে পড়েছেন অনেক জেলে পরিবার। এমনই একজন জেলে কাঁচপুর এলাকার মো. জসিম মিয়া। তিনি বলেন, ‘লক্ষ্যায় আগে ঝাল ফালাইলেই মাছ নিয়া বাড়ি ফিরার উপায় থাকতো না, অত মাছ উঠতো। আর অহন সাড়া দিন নদীর পানি ছাইকা লাইলেও মজুরি খারায় না। আমাগ লগের হগলেই মাছ ধরা ছাইরা দিছে কিন্তু সংসারের অভাবে আমি এহন মাছ ধোরি।’

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার ৪টি নদীকে দখল ও দূষণ মুক্ত রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করেছে। সংশোধন করেছে আইন ও নীতিমালা। তবে তা সচেতনতার অভাবে ব্যক্তি স¦ার্থে এখনো কার্যকর হচ্ছে না। বিভিন্ন শিল্প কারখানার বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) ব্যবহার না করে সরাসরি ফেলা হচ্ছে নদীতে। শীতলক্ষ্যা দূষণের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দফায় দফায় লাখ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এরপরও বন্ধ হয়নি তাদের বর্জ্য ফেলার কার্যক্রম। বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, হাজারের অধিক শিল্পকারখানা এ জেলাতে। এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্র জানাচ্ছে, মাত্র ২১১টি কারখানা (ইটিপি) রয়েছে, তবে সঠিক ব্যবহার করছে না কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফেরদাউস আনোয়ার জানান, ইটিপি থাকার পরেও যে সকল প্রতিষ্ঠান তা ব্যবহার করে না সেগুলোর মাঝে ১৪০টি প্রতিষ্ঠানকে ১০ কোটি ৮৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া আরো ১২২টি ইটিপি বিহীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। অপরদিকে আরএস পর্চা অনুযায়ী, ২০১২ সালে জেলা প্রশাসন ও বিআইডাব্লিউটিএ-এর যৌথ উদ্যোগে শীতলক্ষ্যার উপর একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। এ জরিপে উল্লেখ করা হয়, শীতলক্ষ্যা দুই পাড়ে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার অবৈধ স্থাপনা রয়েছে।

জেলা বিআইডাব্লিউটিএ-এর যুগ্ম-পরিচালক মো. আরিফ উদ্দিন বলেন, ৪টি নদীকে দখল মুক্ত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে ৩৫০৩-নং আইন সংশোধন করে যুগান্তকারী প্রদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তারই ধারাবাহীকতায় সম্প্রতি আমার বন্দরের ৩০ বছরের দখলকৃত জমি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্যর হস্তক্ষেপে রক্তপাত বিহীন উদ্ধার করেছি। তিনি আরো বলেন, বিগত বছরগুলোতে ৭ কিলোমিটর নদীর পাড় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ওয়াক ওয়ে নির্মাণ করেছি। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে দখল মুক্ত করার পরে পুনঃরায় তা দখল হয়ে যায় বলে জানান তিনি। তবে ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরে ভবিষৎতে আর এমন হবে না বলে তিনি আশা করেন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) আওতাধীন যে সব প্রতিষ্ঠান শীতলক্ষ্যা দূষিত করছে সেগুলোর ব্যপারে গত এক বছরে কী ধরণের ব্যবস্থা নিয়েছেন জানতে চাইলে করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী (সিইও) এ.এফ.এম. এহতেশামূল হক বলেন, দায়িত্ব পরিবেশ অধিপ্তরের, তবে আমরা সিটি করর্পোরেশনের পক্ষ থেকে সচেতনতার জন্য বিভিন্ন বিলবোর্ড ফেস্টুন ব্যবহার করছি। যাতে নদীতে কোন ময়লা আর্বজনা না ফেলে।

"