কেশবপুরে ঘের মালিকদের দখলে সব সরকারি খাল

ভয়াবহ বন্যার আশংকা

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

জয়দেব চক্রবর্ত্তী, কেশবপুর (যশোর)

জলাবদ্ধতা আর বন্যা পীড়িত যশোরের কেশবপুর উপজেলার দুর্ভোগ বেড়েছে সরকারি খালগুলো দখল হওয়ার ফলে। কাগজে-কলমে উপজেলায় ১৬৩ খালের কথা উল্লেখ থাকলেও দ্রুত গতিতে পানি নিষ্কাশনের জন্যে ১৫টি সরকারি খালের সন্ধান মিলেছে। আর এই খালগুলোও মাছের ঘের ব্যবসায়ীরা দখল করে নিয়েছেন। ফলে আবারও ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগি এলাকাবাসি। বর্ষা মৌসুমের আগেই খালগুলো উদ্ধার ও নদনদী খনন করে দ্রুত পানি নিস্কাশনের দাবি জানিয়েছেন বন্যা কবলিত কেশবপুরবাসী।

কেশবপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকাঘুরে দেখা ও জানা গেছে, বন্যা কবলিত এ উপজেলায় কাগজে কলমে ১৬৩টি খালের কথা উল্লেখ থাকলেও দ্রুত গতিতে পানি নিষ্কাশনের জন্যে ১৫টি সরকারি খালের সন্ধান মিলেছে, যার অধিকাংশই প্রভাবশালী ঘের মালিকদের দখলে। হরিহর, বুড়িভদ্রা নদী ও কপোতাক্ষ নদের দুকূল দখল হতে হতে মৃতপ্রায় অবস্থা। পলিভরাট হওয়ায় পানি নিস্কাশনে গতিরোধ হয়ে প্রতি বছর বন্যায় সর্বশান্ত হচ্ছে নি¤œ আয়ের মানুষ।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত খালগুলোর মধ্যে পাঁজিয়া ইউনিয়নের হদ খাল (৩ কিলোমিটার) মাস্টার মনিরুল ইসলাম, ঘাঘা-হদের মধ্যবর্তী খাল সাবেক মেম্বার বিশ্বনাথ, মোস্তফা ও রশিদ বিশ্বাস, বুড়–লি; চুয়াডাঙ্গা কানাই শিষের খালের প্রায় ৪ কি.মি. এলাকার সাবেক মেম্বার আঃ কাদের বিশ্বাস, পাঁচপোতা বিলের মঙ্গলকোট-বাদুড়িয়া থেকে হিজলডাঙ্গা পর্যন্ত ৩ কি.মি খাল মঙ্গলকোট এলাকার মহসিন, পৌরসভার মূলগ্রাম-মধ্যকূলের বিল বলখালী ও টেপোর খাল সুলতান ও বাবু, বাঁকাবর্শীর বিল গরালিয়ার খাল ও দুইপাশে প্রায় ৩কি.মি. ভেড়ী হিসেবে দখল করছে বুলু বিশ্বাস, সেলিমুজ্জামান আসাদ, মুজিবুর রহমান চান, কামরুল বিশ্বাস; পদ্ম বিল, কাকলেতলা ও ধর্মপুর-ফতেপুর খালের প্রায় ২ কি.মি. কামরুল বিশ্বাস, কাদারবিলের নেহালপুর খালের কিছু অংশ নজরুল ইসলাম, মহাদেবপুর বিল সংলগ্ন খালটির আংশিক পৌরসভার ভোগতি গ্রামের মুক্তার আলী সহ ২০ জন দখল করে মাছচাষ করে আসছে। এছাড়া হাড়িয়াঘোপ এলাকার হাজুয়ার বিল, কাটাখালীর বিল খুকশিয়া, বিষ্ণুপুর বিলসহ ছোট বড় অনেক খাল স্থানীয় প্রভাবশালী ঘের মালিকরা অবৈধভাবে দখলে রেখেছেন।

ঘের ব্যবসায়ী মঙ্গলকোট ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার আব্দুল কাদের সরকারী খাল দখলের কথা স্বীকার করে বলেন, হাজী মো. মোহসিনের সৈয়দপুর ট্রাস্টের ৬২ সালের রেকর্ডকৃত মালিকানাধীন বুড়–লী খালটি খুলনা জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে প্রতিবছর লীজ নিয়ে আমিসহ প্রায় ২০জন মাছচাষ করে আসছি।

অধিকাংশ ঘেরমালিকরা দখলের কথা অস্বীকার করে ডিসিআর কেটে মাছ চাষের কথা জানান। কিন্তু অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভুমি অফিস কোন সরকারী খাল ডিসিআর দেয়ার বিধান নেই।

ব্যবস্থাপনা কমিটির নেতা ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘের ব্যবসায়িদের অপকৌশল হিসেবে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেন। এর মধ্যে ঘেরের ড্রেনেজ ও পানি নিস্কাশনের পথে লোহার গ্রীল (সাকুনী) দিয়ে আটকে রাখে। শুধু বন্যা নয়, আষাঢ় থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে বৃষ্টি হয়, অবৈধ খাল দখলের কারণে দ্রুত পানি নিস্কাশন না হওয়ায় বোরো মৌসুমে ফসলে বিলম্ব হয়। এতে কৃষকের খরচ বেশি হলেও উৎপাদন যায় কমে। ফলে ফসলে সঠিক দর পান না তারা। এ সময় উপজেলার বিল গরালি, বলখালী, টেপো, বুড়–লি, চুয়াডাঙ্গা, পাথরা, পদ্ম, কাদা, বোয়ালিয়া, নেহালপুর সহ অন্যান্ন স্লুইস গেটে ঘের মালিকরা পানি আটকে রাখার স্বার্থে গেটে অতিরিক্ত গ্রীল, পুরু পলিথীন অথবা মাটি দিয়ে আটকে রাখে। যা বাইরে থেকে দেখা যায় না এভাবে পানি প্রবাহ শ্রোত ও নিস্কাশনে বাঁধাগ্রস্ত করে, যেটি বন্যার অন্যতম কারণ।

খুলনা-যশোর পানি ব্যবস্থাপনা ফেডারেশনের সভাপতি মহির উদ্দীন বিশ্বাস বলেন, উপজেলা বন্যাকবলিত হওয়ার কারণ উপজেলায় প্রবাহিত হরিহর, বুড়িভদ্রা নদী ও কপোতাক্ষ নদে পলি ভরাট, আভ্যন্তরীন খাল ভরাট ও দখল, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা সহ¯্রাধিক ঘেরে শুকনা মওসুমে ডিপটিউবওয়েলের মাধ্যমে গভীর থেকে পানি উঠিয়ে মৎস্য ঘের ভরাট করায় বর্ষা মৌসুমে ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। বৃষ্টির পানি উপচে পড়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ঘেরের ড্রেনেজ ও পানি নিস্কাশনের পথে লোহার গ্রীল (সাকুনী) দিয়ে আটকে রাখে। তিনি জানান, চলতি বর্ষা মৌসুমের আগেই নদী ও সরকারী খালগুলো দখলদারদের কবল থেকে উদ্ধার ও খনন করা না হয়, তবে প্রতিবারের থেকে এবার ভয়াবহ বন্যার আশংকা রয়েছে।

এ বিষয়ে কেশবপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সায়েদুর রহমান জানান, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা শত শত অবৈধ ঘের খাল দখল এবং নদ-নদীতে পর্যাপ্ত পলি পড়ে ভরাট হওয়ায় প্রতিবছর বন্যা এবং জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে এবার বৃষ্টি মৌসুমের আগেই প্রত্যেকটি সরকারী খাল দখলমুক্ত করে বন্যা মোকাবেলার জন্য কেশবপুরের সংসদ জণপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মহদয়ের নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ চলছে।

কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মিজানূর রহমান এব্যাপারে জানান, বর্ষা মৌসুমের আগেই প্রত্যেকটি সরকারী খাল দখলমুক্ত করা হবে।

"