ভূমিহীনদের অর্ধশত কোটি টাকার জায়গায় প্রভাবশালীর কারখানা

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

আশরাফুল আলম, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মেঘনা ইসলামপুর এলাকায় প্রায় পাঁচ বিঘা সরকারি জমি অবৈধভাবে বালু ভরাট করে ভবন নির্মাণ করেছেন আল মোস্তফা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয়ভাবে যার বাজার মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এ কাজে সহযোগীতা করেছেন স্থানীয় মেঘনাঘাট এলাকার ক্ষমতাসীন দলের কিছু লোক। এর প্রতিবাদ করলে মিথ্যা মামলা ও নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।

গতকাল বুধবার সরেজমিনে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯১ সালে উপজেলার মেঘনা শিল্পাঞ্চল এলাকার ইসলামপুর গ্রামে (চর রমজান সোনাউল্লা মৌজার চরভাঙ্গা এলাকা) সহায়, সম্বলহীন, দুঃস্থ জনগণের আবাসনের জন্য ‘ইসলামপুর আদর্শগ্রাম’ নামে প্রায় শতাধিক পরিবারকে বরাদ্দ দেয় সরকার। এরপর থেকেই ওই পরিবারগুলো কেউ কেউ তাদের পাওয়া জায়গায় বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, গত পাঁচ বছর আগে থেকে ধীরে ধীরে আদর্শগ্রামের খালি জায়গায় আল মোস্তফা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান ‘ভুয়া দলিল’ বলে বালু ভরাট করে কারখানা নির্মাণ করেছে। এ কাজে সহযোগিতায় করছেন স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আলী আকবর, যুবলীগ কর্মী সাহাবউদ্দিন প্রধান, আলম চাঁনসহ একটি প্রভাবশালীরা। তাদের দখলের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলেই মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠিয়েদেন মোস্তফা গ্রুপের লোকজন।

এলাকাবাসীর দাবি, সম্প্রতি ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা মঈনুদ্দীন নাঈম, হযরত আলী, সামছুল হক, হালিম মিয়া, ডালিম হোসেন, আব্দুল আউয়াল ও মনির হোসেনসহ প্রায় অর্ধশতাধিক নিরীহ মানুষকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে তাদের উপর নির্যাতন চালিয়েছেন অবৈধ দখলদার সিন্ডিকেট।

ইসলামপুরের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মোস্তফা বলেন, “আমরা মুক্তিযোদ্ধা পল্লী উন্নয়ন সমবায় সমিতির নামে ইসলামপুর এলাকার খাস জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু ভূমিদস্যু ‘জামাই মোস্তফা’ ও তার ভাই ইকবাল হোসেন ওই জায়গাটি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করে ফেলেছেন। সরকারি দপ্তর থেকেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিজেদের জীবন বাজি রেখে এ জন্যই দেশ স্বাধীন করেছিলাম। ভূমিদস্যু রাজত্ব দেখার জন্যই!’ স্থানীয় নূর মোহাম্মদ বলেন, “সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যু ‘জামাই মোস্তফার’ অপকর্মের বিরোধিতা করায় আমার বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছেলে, ভাই-ভাতিজার বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলাসহ একাধিক মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাছির উদ্দিন, সাহাব উদ্দিন ও আলম চাঁন জানান, তারা কোন বালু ভরাট ও দখলের সঙ্গে জড়িত নন। অবৈধ দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে আল-মোস্তফা প্রিন্টিং ও প্যাকেজিং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ‘জামাই মোস্তফা’ ও পরিচালক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমরা কোনো জায়গা জোর করে দখল করিনি। নিয়ম অনুযায়ী সরকার থেকে বরাদ্দ নিয়েই কারখানা স্থাপন করেছি।’

উপজেলার পিরোজপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুম বলেন, ‘অবৈধভাবে সরকারি জায়গা কোন ভাবেই দখল করতে দেওয়া হবে না।’

উপজেলা ইসলামপুর গ্রামের জায়গা সরকারিভাবে অসহায়-দুঃস্থদের বরাদ্দে কথা স্বীকার করে সোনারগাঁ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বি এম রুহুল আমিন রিমন বলেন, ‘ভূমিহীনদের নামে বরাদ্দ হওয়া কোনো জায়গা কোনো কারখানা বা প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ হওয়া দেওয়া হয়নি। সরকারি জায়গা দখলকারীদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রাব্বি মিয়া বলেন, ‘কেউ সরকারি জায়গা অবৈধভাবে দখল করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

"