করোনা আতঙ্কে পোশাকশিল্পে সংকট

প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০২০, ০০:০০

নারায়ণগঞ্জ প্রতিবেদক

বর্তমানে তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি খাত। দেশের আর্থিক পরিস্থিতি অনেকটাই পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এর সঙ্গে জড়িত দেশের লাখ লাখ মানুষ ও তাদের জীবিকা। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে করোনা আতঙ্কের কারণে অনেক বায়ার তাদের অর্ডার বাতিল বা স্থগিত করছে।

বোদ্ধামহলের ধারণা, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে এ শিল্প খাত, সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থসামাজিক ব্যবস্থা। গার্মেন্ট মালিকরা নতুন রফতানি আদেশ না পাওয়াতে বন্ধ হয়ে যেতে পারে অনেক গার্মেন্ট। পোশাকশ্রমিকদের বেতন দেওয়া নিয়েও তৈরি হবে বড় ধরনের সংকট। এদিকে সামনে রোজার ঈদ। যে কারণে সব মিলিয়ে সামনে ভয়াবহ সংকট অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন গার্মেন্ট মালিকরা।

জানা গেছে, নিয়ন্ত্রণহীন করোনাভাইরাসের কারণে টালমাটাল জনস্বাস্থ্য ও বিশ্ব অর্থনীতি। বিপর্যন্ত বাংলাদেশের পোশাক খাতও। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএ বলছে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় বদলাচ্ছে ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত। বিকেএমইএসহ সভাপতি (অর্থ) ও আরএস কম্পোজিটের মালিক মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল জানান, বর্তমানে গার্মেন্ট সেক্টরের অবস্থা অতিমাত্রায় ভয়াবহ। গত ১২ মার্চ আমার একটি দেড় লাখ পিসের শিপমেন্ট ছিল সেটা কাভার্ড ভ্যানে লোড করার পড় মেইল আসে স্থগিত করার জন্য। গত মঙ্গলবার একই বায়ারের আরো দেড় লাখ পিস শিপমেন্ট হওয়ার কথা ছিল সেটাও স্থগিত করার মেইল এসেছে। এ দুটি শিপমেন্টের ব্যাক টু ব্যাক এলসির সব পেমেন্ট করা হয়েছে কিন্তু বায়ার জানিয়ে দিয়েছে, দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে কোনো ধরনের পেমেন্ট দিতে পারবে না। আমার আরেক বায়ার সোয়া লাখ পিসের অর্ডার বাতিল করেছে। ইতালিতে আমার একটি শিপমেন্ট পোর্টে পৌঁছালেও বায়ার সেটা রিসিভ করতে পারছে না কারণ সেখানে হোম কোয়ারেন্টাইন চলছে। ওই বায়ারও কয়েক মাসের মধ্যে কোনো ধরনের পেমেন্ট দিতে পারবে না বলে জানিয়েছে। বায়াররা মেইল দিয়েছে নিটিং কাটিং ডাইং যে অবস্থায় রয়েছে সেটা হোল্ড করতে। আমার মতো বাকি গার্মেন্ট মালিকদেরও একই অবস্থা। তারাও আমাকে কল দিয়ে জানতে চেয়েছে এখন কী করার কিন্তু আমি কাউকেই উত্তর দিতে পারছি না। একমাত্র আল্লাহর রহমত ছাড়া এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো পথ দেখছি না। সামনের মাসে শ্রমিকদের বেতন দিতে পারব কি-না জানি না। আমাকে যারাই কল দিচ্ছে তাদের একটা কথাই বলছি, যাতে পার্টি পেমেন্ট না দিয়ে হলেও শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্য অর্থ সঞ্চয় করে রাখে। কারণ শ্রমিকরা প্রতি মাসে তাদের মজুরি দিয়ে বাড়ি ভাড়া দোকান বাকি দিয়ে থাকে। নিট সেক্টরে বর্তমানে ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ কারখানা এফেক্টেড। আগামী এক সপ্তাহ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ৯৯ ভাগ কারখানাই এফেক্টেড হবে। শ্রমিকদের কাছে আমার অনুরোধ তারা যাতে অযথা সঞ্চিত অর্থ খরচ না করে।

এ প্রসঙ্গে বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমার পোল্যান্ডের এক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান দুই দফার রফতানি আদেশ বাতিল করেছে। এর মধ্যে একটি আদেশ ছিল ২ লাখ ২০ হাজার ডলারের। আরেকটি আদেশ ছিল ২ লাখ ডলারের। তিনি জানান, করোনার কারণে এখন প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায় রফতানি আদেশ বাতিল বা স্থগিতের মেইল পাচ্ছেন গার্মেন্ট মালিকরা। এ অবস্থায় সরকার যদি আমাদের পাশে না দাঁড়ায় তাহলে আমরা মারা পড়ব।

বিকেএমইএর পরিচালক মাদার কালার লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী এম মনসুর আহমেদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য ফেরত যাচ্ছে। ইউরোপ থেকে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো অর্ডার বন্ধ রেখেছে। ইতালি, জার্মানি তো প্রচুর পণ্য নেয়। এখন ইতালির যে অবস্থা সেখানের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো তো ফোনই ধরে না। করোনা মোকাবিলা করতে না পারলে গার্মেন্ট শিল্প ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে, গার্মেন্ট টিকবে না।

বিকেএমইএর সচিব সুলভ চৌধুরী জানিয়েছেন, কয়েক দিনে শতাধিক নিট কারখানার কার্যাদেশ বাতিল ও স্থগিত করেছে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। কারো অর্ডার স্থগিত করে রেখেছেন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। বিকেএমইএর তো অনেক সদস্য। আমরা সবার সঙ্গেই কথা বলছি। তিনি আরো বলেন, গার্মেন্ট খাতের জন্য বিরাট হুমকি। সামনে ঈদ। শ্রমিকদের বেতনের বিষয়টিও আরেক চ্যালেঞ্জ।

 

"