নারায়ণগঞ্জ

বাড়ছে অগ্নিকাণ্ড : দরকার বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

আবদুল আলীম, নারায়ণগঞ্জ

ঢাকার অদূরে দেশের ঘনবসতিপূর্ণ জেলাগুলোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ অন্যতম। এ জেলায় দেশের শিল্পাঞ্চলসহ ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠেছে অনেক ছোট-বড় কারখানা। কর্মসংস্থানের খোঁজে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এ জেলায় ছুটে আসে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ কারণে অন্য শহরগুলোর মতো নারায়ণগঞ্জেও জনসংখ্যার চাপ ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে নানা দুর্ঘটনা। যার মধ্যে অগ্নিকা-ের ঘটনা অন্যতম। বাড়ছে আগুনে পোড়া রোগীর সংখ্যা। তাই এলাকার বিশিষ্টজনদের দাবি, নারায়ণগঞ্জ শহরে হাসপাতালে এখন দরকার বড় আকারের বার্ন ইউনিট।

এ জেলায় কমবেশি ৫০ লাখ লোকের বাস। তাদের চিকিৎসার জন্য সরকারিভাবে রয়েছে ৩০০ শয্যার একটি হাসপাতাল, কিন্তু তাতে নেই অগ্নিদগ্ধদের জন্য স্পেশালাইজড বার্ন ইউনিট।

পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসকরা রোগীদের ঢাকায় পাঠানোর নির্দেশনা দেন। তাই নারায়ণগঞ্জে আধুনিক বার্ন ইউনিট গড়ে তুললে অগ্নিদুর্ঘটনায় বাঁচবে বহু প্রাণ। সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, অবিলম্বে যাতে নারায়ণগঞ্জে একটা আধুনিক বার্ন ইউনিট গড়ে তোলা হয়। জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দেওয়া তথ্যানুসারে, ২০১৯ সালে নারায়ণগঞ্জে ৪৯৫টি অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। ২০২০ সালের প্রথম মাসেই ৪২টি অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস কর্তৃক জানা যায়, এসব ঘটনার মধ্যে ৯০ শতাংশ ঘটনার কারণ হিসেবে তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। চুলার আগুন, বৈদ্যুতিক গোলযোগ ও সিগারেটের টুকরো থেকেই অধিকাংশ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে।

সম্প্রতি গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সদর উপজেলার ফতুল্লার সাহেবপাড়া এলাকায় একটি বাড়িতে অগ্নিকা-ের ঘটনায় একই পরিবারের আটজন দগ্ধ হয়েছেন। দগ্ধরা হলেনÑ নূরজাহান বেগম, তার বড় ছেলে কিরণ, কিরণের দুই ছেলে আবুল হোসেন, আপন। কিরণের ছোট ছেলে হিরণ, হিরণের স্ত্রী মুক্তা, তাদের মেয়ে ইলমা ও কিরণ হিরণের ভাগিনা কাওসার। তাদের মধ্যে নূরজাহান বেগম ও তার ছেলে কিরণ ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মারা যায়।

চলতি বছরের ২ জানুয়ারি সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী সিআইখোলার একটি ফ্ল্যাট বাসায় চুলা থেকে জমা থাকা গ্যাসের আগুনে স্বামী-স্ত্রীসহ একই পরিবারের তিনজন দগ্ধ হয়েছেন। তারা হলেন কবির হোসেন (৬৫), তার স্ত্রী রেখা বেগম (৫৫) ও মেয়ে সুফিয়া (২৮)। দগ্ধদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

গত ৭ জানুয়ারি ফতুল্লায় একটি বাড়িতে চুলার গ্যাসলাইনে লিকেজ থেকে গ্যাসের বিস্ফোরণ হয়ে আগুনে শরীফ ও ফরিদা নামে এক দম্পতি দগ্ধ হয়েছেন। এলাকাবাসী দগ্ধ স্বামী-স্ত্রীকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে শহরের ৩০০ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।

গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর সোনারগাঁওয়ে শিশু সন্তানের খাবার তৈরি করতে গিয়ে আগুনে ঝলসে যান তাসলিমা নামে এক গৃহবধূ। তার শরীরের ১৬ শতাংশ ঝলসে গেছে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাসলিমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।

এর আগে গত বছরের ২২ নভেম্বর সদর উপজেলার ফতুল্লার মুসলিমনগর এলাকায় টিনের দোতলা বাড়িতে অগ্নিকা-ে শম্পা আক্তার (২০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়।

নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার অমিত রায় এ বিষয়ে বলেন, আমাদের এখানে দগ্ধ রোগী বেশি গুরুতর হলে আসলে তাদের ঢাকার হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ছাড়া রোগী কম পুড়লে তাকে সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে বিকেলে বা রাতে এলে রোগীদের ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

৩০০ শয্যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৩০০ শয্যা হাসপাতাল ৫০০ শয্যা হলে হাসপাতালে দগ্ধ রোগীর চিকিৎসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে। নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক ডাক্তার (আরএমও) আসাদুজ্জামান বলেন, জেনারেল হাসপাতালে বার্ন ইউনিট নেই। কিন্তু দগ্ধ রোগীরা হাসপাতালে এলে তাদের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয়। রোগীর অবস্থা বেশি খারাপ হলে তাদের ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নিয়ে যেতে নির্দেশ করা হয়।

নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি এ বি সিদ্দিক বলেন, জেলায় অগ্নিকা-ের ঘটনা দু-এক দিন পরপর শুনছি। সে ক্ষেত্রে মানুষের চিকিৎসা নিরাপত্তার জন্য নারায়ণগঞ্জে বার্ন ইউনিটের প্রয়োজন রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে ভেবেছি সিভিল সার্জনের কাছে আবেদন করব, জেলার দুটি বড় সরকারি হাসপাতালের যেকোনো একটিতে দ্রুত বার্ন ইউনিটের ব্যবস্থা করা হোক। যেন দগ্ধ রোগীরা এখানেই সেবা নিয়ে সুস্থ হতে পারে।

এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইমতিয়াজ বলেন, নারায়ণগঞ্জ ঢাকার নিকটবর্তী হওয়ায় দগ্ধ রোগীরা ঢাকায় সেবা গ্রহণ করতে পারেন। তবে নারায়ণগঞ্জে একটি বড় ও বিশেষায়িত বার্ন ইউনিটের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল আরেফীন বলেন, নারায়ণগঞ্জে অগ্নিকা-ের ঘটনা অহরহ ঘটছে। আর শীতের মৌসুমে অগ্নিকা-ের ঘটনা অনেক বেড়ে যায়। তাই মানুষের জীবন নিরাপত্তায় জরুরিভাবে সেবার প্রয়োজন রয়েছে। নারায়ণগঞ্জে বার্ন ইউনিট হলে জেলার মানুষের অনেক সুবিধা হবে।

 

"