তামাক আইনের প্রয়োগ চাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

বিশেষ প্রতিবেদক, রাজশাহী

তামাক খাত থেকে বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব আয় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু তামাক ব্যবহারজনিত অসুস্থতায় বছরে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। আর তামাকের কারণে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬১ মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ধূমপানমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ার পরিকল্পনার কথা বললেও খোদ সরকারের বিভিন্ন দফতরের হাতেই একটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানির ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অগ্রগতি নিয়ে অনুসন্ধানকালে এমনই তথ্যচিত্র উঠে এসেছে। তাই একটি তামাক কোম্পানিতে সরকারের যে শেয়ার রয়েছে সেটি প্রত্যাহারের পাশাপাশি বাংলাদেশকে ধূমপানমুক্ত একটি দেশ গড়ার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে প্রধানমন্ত্রীর ধূমপানমুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণে বাধার সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন রাজশাহীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা বাংলাদেশে তামাকের উৎপাদন বন্ধসহ তামাকের বহুজাতিক কোম্পানির ব্যবসায় সরকারের শেয়ার প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।

জানা গেছে, ‘তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ সূচক বাংলাদেশ ২০১৯’ এর আলোকে ‘ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল-এফসিটিসি’ আর্টিকেল ৫.৩ বাস্তবায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ীÑ এবার বাংলাদেশের স্কোর ৭৭, যা গতবার ছিল ৭৮। এক ধাপ এগোলেও তা সন্তোষজনক নয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের ৩৩টি দেশের মধ্যে যে ৩টি দেশে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে মাত্র জাপান ও জর্ডান।

আর এই হস্তক্ষেপের মূল কারণ হলোÑ তামাক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার এবং তামাক কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে সরকারের উচ্চপদস্থ কয়েকজনের অবস্থান। তামাক কোম্পানিতে সরকারের অংশীদারিত্বের সুযোগে কোম্পানিগুলোর জন্য তামাক নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপে হস্তক্ষেপ করা সহজ হয়েছে। এতে জনস্বাস্থ্য ক্ষতির মুখে পড়ছে।

এক জরীপ অনুযায়ী, দেশে তামাকজনিত রোগে বছরে ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। তামাক ব্যবহারজনিত মৃত্যু ও অসুস্থতায় বছরে ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়, যা তামাক খাত থেকে অর্জিত রাজস্ব আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। এ কারণে অকালমৃত্যু রোধ এবং কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি লাঘবে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি রাজশাহীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টারের শিক্ষার্থী আবদুর রাজ্জাক শিশির বলেন, ‘২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত ঘোষণা করতে চাইলে অবশ্যই তামাক কোম্পানিতে সরকারের যে শেয়ার রয়েছে সেটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত। তামাকের চাষ আইন করে বন্ধ করার পরামর্শ তার। আইনজীবী নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘তামাক নিয়ন্ত্রণের আইন বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগ অপ্রতুল। তামাক কোম্পানিতে সরকারি শেয়ার প্রত্যাহারের পাশাপাশি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে সরকারকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, ‘তামাক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার থাকলে সরকার দেশকে কীভাবে তামাকমুক্ত করবে। পাবলিক প্লেসে ধূমপান না করার আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও কোনো উদ্যোগ নেই। সত্যিকার অর্থে তামাক নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে তামাক কোম্পানিতে থাকা শেয়ার প্রত্যাহার করে নিতে হবে।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মামুন আবদুল কাইয়ুম বলেন, প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের কথা বলেছেন ২০৫০ সালেও যদি দেশ তামাকমুক্ত হয়, তারপরও আলটিমেটলি আমাদের চাওয়া যেন পূরণ হয়। সরকার যেমন আইটি সেক্টরকে খুব বেশি প্রাইয়োরিটি দিচ্ছে। তামাক নিয়ন্ত্রণেও যদি এমন প্রাধান্য দেয় তাহলে প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহজ হবে।

উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট-এসিডি’-এর তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. শাহীনুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশকে ধূমপানমুক্ত একটি দেশ গড়ার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিবে এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।’ অ্যাসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট-এসিডির মিডিয়া ম্যানেজার আমজাদ হোসেন শিমুল বলেন, ‘তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকারের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন জরুরি ভিত্তিতে করতে হবে।’

"