চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণ চাক্তাই এখন আবর্জনার ভাগাড়

* বর্ষা মৌসুমেও পানিশূন্য * জমে আছে ময়লার স্তূপ * ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

তাজুল ইসলাম পলাশ, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট মোড় থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে চাক্তাই খালকে একসময় বলা হতো নগরীর প্রাণ। বছর বিশেক আগে এই খালে সারা বছরই থাকত টলমলে পানির প্রবাহ। কিন্তু দখলবাজি আর সংস্কারের অভাবে খালটি ক্রমেই ভরাট হয়ে গেছে। ওই খালের পানি এখন নোংরা আর দুর্গন্ধ, সেটা এখন মশা উৎপাদনের কারখানা। নগরীর মাঝ দিয়ে বয়ে চলা চাক্তাই খালের এই করুণ দশাও মশকবাহিত রোগের অন্যতম কারণ।

চাক্তাই খাল এখন কার্যত নগরবাসীর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা মৌসুমে অন্তত পরিচ্ছন্ন টলমলে পানি থাকার কথা থাকলেও সেখানে তা নেই। ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে পানির রং হয়ে গেছে কালো আর ঘন। দুর্গন্ধও বটে। এতে ভাসছে পলিথিন, ময়লা-আবর্জনা। খালের কোনো কোনো অংশে জমে আছে মাটির স্তূপ। পানির প্রবাহ নেই। শুধু জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্যই নয়, মশার প্রকোপ থেকে বাঁচতেও চাক্তাই খাল খনন ও সংস্কার করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০০৩ থেকে ২০০৪ সালের দিকে প্রয়াত সাবেক মেয়র আলহাজ এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র থাকাকালীন সাড়ে ৯ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত গভীরতা রেখে চাক্তাই খালের চার কিলোমিটার পাকা করে দেওয়া হয়। এতে সমাধানের চেয়ে সমস্যাই বেশি হয়। কারণ তলা পাকা করার কারণে দুই তিন বছরের মধ্যে বালু, মাটি ও ময়লা আবর্জনা ও পলিথিনের স্তর জমে খালটি আবার ভরাট হয়ে যায়। তারপর থেকে আর খনন করা হয়নি।

গত ২২ জুলাই চাক্তাই খালের বহদ্দারহাট সংলগ্ন অংশ প্রথম উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। প্রায় ৬০টি স্থাপনা উচ্ছেদ করে ৩ কিলোমিটার জায়গা উদ্ধার করা হয়। নগরীর ১৩ খালে পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী স্থাপনা উচ্ছেদে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় অভিযান শুরু করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃৃপক্ষ (সিডিএ)। তারপর ভারী বর্ষণে নগরীতে কয়েক দফায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে উচ্ছেদ কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। এরপর থেকে খালের কিছু কিছু অংশে ময়লার স্তূপ তৈরি হয়। জমে থাকে ময়লার ভাগাড়। তার ওপর পলিথিন ও প্লাস্টিকের মোড়কে জমা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকার ব্রিজ প্রান্তে ওয়াকওয়েজুড়ে ঝুপড়ি ঘর তুলে সবজি বেচাকেনা হচ্ছে। গড়ে উঠেছে ছোটো-খাটো বাজার। সন্ধ্যার পর বাজারের বর্জ্য ফেলা হয় খালে। ওয়াকওয়ের পাশেই বিশাল চুলায় চলছে রান্নাবান্নার কাজ। ওয়াকওয়ের ব্রেঞ্চগুলো এতটাই ময়লা যে সেখানে বসার অবস্থা নেই। খনন করার পর স্বচ্ছ পানি থাকার কথা থাকলেও খালে আছে ময়লা আর আবর্জনা। সেখানে থেকে বের হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ। মশা, মাছি এবং পোকামাকড়ের অভয়াশ্রম হিসেবে পরিণত হয়েছে নগরীর চাক্তাই খাল।

পরিবেশ আন্দোলনের নেতা মোহাম্মদ বখতিয়ার প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, এ বিষয়ে করপোরেশনকে আরো ভালো করে নজর দেওয়া দরকার। মানুষের মাঝেও সচেতনতা আসতে হবে।

চকবাজার বাঁদুরতলা এলাকার বাসিন্দা জালাল উদ্দিন মিজান বলেন, পানি কমে যাওয়ায় খালের ময়লার স্তূপ এখন মশা প্রজননের অন্যতম স্থান।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শফিকুল মান্নান সিদ্দিকী গত বৃহস্পতিবার প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। তিনি বলেন, অপরিষ্কার পানিতে এডিস মশা ডিম পারে না। পরিষ্কার পানিতে ডিম পারে।

সিডিএ সূত্রে জানা যায়, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সবার আগে আগ্রাবাদ-হালিশহর, বাকলিয়া-চান্দগাঁও ও মুরাদপুর-বহদ্দারহাট এলাকার প্রতি নজর দেওয়া হচ্ছে। প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের অধীনে ৩৬টি খাল খনন ছাড়াও ৪৮টি গার্ডার ব্রিজ, ৬টি কালভার্ট, খালগুলোতে ৪২ সিল্ট ট্র্যাপ (বালি জমার স্থান), ৫ খালের মুখে টাইডাল রেগুলেটর, খালের উভয় পাশে থাকবে ১৫ ফুট চওড়া রোড থাকছে। আর এস শিট অনুযায়ী খালের উভয় পাশের জায়গা উচ্ছেদের কথা থাকলেও প্রাথমিকভাবে পরবর্তি বর্ষা মৌসুমের জন্য ১৬ খাল নিয়েই এগোচ্ছে সংস্থাটি। এদিকে শিগগিরই খাল খননের কাজ শুরু হবে শুরু হবে বলে জানান জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক ( মেঘা প্রকল্প) লে. কর্নেল শাহ আলী। তিনি বলেন, যেখানে পানির মুভমেন্ট আছে তার পাশে শুকনা জায়গায় এডিস মশা ডিম পাড়ে। আর ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধ পানিতে ডিম পাড়ে ম্যালেরিয়া সংক্রমক মশা।

"