রামেকে সক্রিয় দেড় শতাধিক দালাল, রোগীদের ভোগান্তি

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

এস এইচ এম তরিকুল, রাজশাহী

রাজশাহীর চিকিৎসাসেবা এখন দালালনির্ভর হয়ে পড়েছে। প্রতারণা চক্রের ছোবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে দু-এক দিন প্রশাসন নজরদারি করলেও, কিছুদিন পর পরিস্থিতি ফের আগের দশায় ফিরে আসে। দালাল চক্রের সদস্যদের কেউ কেউ গ্রেফতার হলেও মূল হোতারা বরাবরের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে।

এ বিষয়ে রোগীর স্বজন পরিচয় দেওয়ার পর একাধিক দালাল জানায়, তারা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যান নগরীর লক্ষ্মীপুরের আল্ট্রাপ্যাথ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। হাসপাতালের অসাধু কর্মকর্তা ও পুলিশকে মাসোহারা দিয়েই এ কর্মকা- চালাচ্ছেন তারা। তাদের নেতার নাম ফজলুর রহমান পলাশ, সে আল্ট্রাপ্যাথ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও আরোগ্য নিকেতনের লোক। এই পলাশ সিন্ডিকেট চক্রের হোতা। ওই সিন্ডিকেটের সদস্য সংখ্যা ১০৭ থেকে বেড়ে দেড় শ জনে ঠেকেছে। এদের মধ্যে রামেক হাসপাতালের বহির্বিভাগে কাজ করে ৭২ জন। যাদের মধ্যে নারী দালালের সংখ্যা ১৮ জন। সবাই শতকরা ৫০ শতাংশ কমিশনে কাজ করে। এ কমিশনের টাকা আসে রোগীর কাছ থেকে আদায় করা অংশ থেকে। তবে প্রশাসনকে ম্যানেজ করার অজুহাতে প্রতি দালালের কাছ থেকে প্রতিদিন দেড় শ টাকা কেটে রাখে সিন্ডিকেট প্রধান পলাশ।

তাদের দেওয়া তথ্য মতে, এই চক্রের দেড় শ সদস্যদের কাছ থেকে পলাশের প্রতিদিন আয় ২২ হাজার ৫০০ টাকা। এ হিসেবে প্রতি মাসে অতিরিক্ত আয় ৬ লাখ ৭৫ হাজার। এভাবেই গত ৩০ বছর ধরে দাপটের সঙ্গে সে দালাল সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু শুরুর থেকেই তিনি রয়েছেন অধরায়। যে কারণেই তিনি এখন শতকোটি টাকার মালিক হয়েছে বলে অভিমত খোদ তারই দালাল সদস্যদের।

দালালদের দেওয়া তথ্য মতে, রাজশাহী নগরীতে চিকিৎসাসেবাকেদ্রিক পরিচালিত ৫টি দালাল সিন্ডিকেটের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে পলাশ গ্রুপ। ওষুধ বিক্রির দিক থেকেও সে প্রথম স্থানে রয়েছে। হাসপাতালের কিছু অসাধু চিকিৎসক, সেবিকা ও স্টাফরাই রোগীদের সিন্ডিকেট নির্ধারিত ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনার নির্দেশনা দেন। অন্য স্থান থেকে ওষুধ কিনলেও তাদের চিকিৎসা করে না সিন্ডিকেটের চিকিৎসকরা।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই তারা তাদের এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধের দোকান ও বেসরকারি হাসপাতালের শেয়ারহোল্ডার বা মার্কেটিং অফিসারের ব্যানারেও এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব দালাল রোগীদের ধরতে ওত পেতে থাকে। ভালো চিকিৎসা দেওয়ার নাম করে নিম্নমানের বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। আর সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কমিশন বাগিয়ে নেয়।

এদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নেওয়ায় এরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মাঝেমধ্যে দু-একটি করে চুক্তিহীন দালাল ধরা পড়ে। যাদের দালাল সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকেই ধরিয়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এরপর তারাই আবার পুলিশ সঙ্গে আঁতাত করে ওই দালালকে ছাড়িয়ে সিন্ডিকেটের সদস্য করে নেয়।

সূত্র মতে, রামেক হাসপাতালকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুর ও ঘোষপাড়া মোড়সহ আশপাশের দুই শতাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ১০-১২টি ছাড়া সবগুলোই দালালনির্ভর। সেসব প্রতিষ্ঠানে রোগী আনতেই রামেক হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোরে দেড় শতাধিক দালাল কাজ করে।

অভিযোগ মতে, হাসপাতাল পুলিশ বক্স ও হাসপাতালে কর্মরত আনসার বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে দৈনিক ও মাসিক মাসোহারা চুক্তিতে এসব দালাল নিরাপদে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ সিন্ডিকেটের প্রধান ফজলুর রহমান পলাশের ম্যানেজার হুমায়নের মাধ্যমে চুক্তি করা টাকা প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। সূত্র জানায়, পুলিশ বক্স ইনচার্জকে তিনি প্রতি মাসে ৬০ হাজার ও আনসার কমান্ডারকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। আর পলাশ চুক্তির বাইরে প্রতিদিন টোকেন মানি হিসেবে প্রতি দালালের কাছ থেকে রোগীপ্রতি দেড় শ টাকা কেটে নেয়। প্রতিবাদ করলেই পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, ভাগিয়ে আনা রোগী বা তার স্বজনদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে সন্তুষ্টি অর্জনে বকশিশও বেশি পেয়ে থাকে দালালরা।

সূত্র বলছে, আল্ট্রাপ্যাথের ডা. শেফাত রাব্বি সব রোগ বিশেষজ্ঞ। তার কাছে দালালরা রোগী নিয়ে গেলে তিনি বিভিন্ন রোগ পরীক্ষার নামে দুই থেকে পাঁচ গুণ টাকা বিল করেন। এরপর ভাগবাটোয়ারা হয়। এ ছাড়া বহির্বিভাগের ৪২ নম্বর কক্ষের ডা. ইসতিয়াক আহমেদকে আল্ট্রাপ্যাথ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক বলে পরিচয় দিয়ে রোগীদেও প্রতারণা করে।

অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাদের পছন্দমতো (চুক্তিভিত্তিক) ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়া দেখেন না। যার কারণে রোগীদের আবার টাকা খরচ করে সেসব স্থানেই পরীক্ষা করতে হয়। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রামেক হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে প্রবেশের পর দালালরা হঠাৎ করেই রোগী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মুহূর্তেই সেরে নেয় টিকিট কাটাসহ যাবতীয় কাজ। এই দালালদের দেখে মনে হবে হাসপাতালের স্টাফ। তাদের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে যায় রোগী ও স্বজনরা।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে গতকাল রোববার দুপুরে দালাল সিন্ডিকেটপ্রধান ফজলুর রহমান ওরুফে পলাশ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘আমার নির্ধারিত কোনো দালাল নেই। যারা এ ধরনের কাজ (দালালী) করে তারা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই কমিশন পেয়ে থাকে।’

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. শেফাত রাব্বি বিষয়ে বলেন, ‘তিনি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। তবে গাইনিসহ অন্যান্য রোগের রোগীগুলোকে আমরা বাইরে থেকে দেখিয়ে আনি।’

এর আগে পত্রিকায় প্রকাশ না করানোর অনুরোধ জানিয়ে পলাশ বলেন, দালাল ছাড়া এখানে কেউ ব্যবসা করতে পারে না। যে কারণে খুশি করতে হয় হাসপাতাল পুলিশ বক্স, আনসার কমান্ডার এবং লক্ষ্মীপুর পুলিশ বক্স প্রধানকে। নয়তো, ধরে নিয়ে গিয়ে বক্সে আটকে রাখে। এরপর তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিলে ছেড়ে দেয়। টাকা না দিলে কোর্টে চালান করে দেয়। মানসম্মানের কথা ভেবে আমার লোকদের ছাড়িয়ে নিই। তবে এরা দালাল নয়, স্টাফ বলেও দাবি করেন পলাশ।

অভিযোগ অস্বীকার করেন রামেক হাসপাতাল পুলিশ বক্সের ইনচার্জ এএসআই রফিকুল ইসলাম। আর অভিযোগের বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে বারবার চেষ্টা করেও রামেক হাসপাতালের আনসার বাহিনীর প্লাটুন কমান্ডারকে (পিসি) না পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

"