সিলেট লালাবাজার-নাজিরবাজার রাস্তা

সড়ক নয়, যেন মৃত্যুকূপ

প্রকাশ : ২০ জুন ২০১৯, ০০:০০

তুহিন আহমেদ, মহানগর (সিলেট)

মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার লালাবাজার থেকে নাজিরবাজার মহাসড়ক। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের এই অংশটিতে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। ফলে এই মহাসড়কের যাত্রীদের মধ্যে এক চাপা আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে গত বছরেও এই সড়কে প্রায় ১২টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৭ জন। আর লালাবাজার এলাকাতেই দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১০ জন। যাত্রীরা মনে করেন, গাড়ি চালানোর সময় চালকদের অসচেতনা ও অসতর্কতার কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে।

সর্বশেষ গতকাল বুধবার শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় মহাসড়কটির লালাবাজারে অটোরিকশার দুজন যাত্রী নিহত হয়েছেন। ওই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো চার যাত্রী। নিহত আবদুল কাইয়ুম হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার গাবরু মিয়ার ছেলে। এ ছাড়া নিহত আরেকজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

এর আগে গত বছরের ১৯ আগস্ট ওভারটেক করতে গিয়ে ট্রাকচাপায় মারা যান আলফু মিয়া নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী। এমনটি এর আগের দিন ১৮ আগস্ট দুপুরেও ট্রাকচাপায় আলাউদ্দিন নামের আরেক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। ১৫ জুলাই বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষের ৪ যাত্রী মারা যান। এতে আহত হয়েছিলেন অন্তত ৪০ জন যাত্রী, যা ওই বছরের সড়কের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ছিল। এর আগে ২০ জুলাই ট্রাকচাপায় নারী পথচারী, ১ জুলাই বাসের ধাক্কায় একজন, ২৬ মে ট্রাক লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন, ১৯ মার্চ দুর্ঘটনা হলেও কেউ নিহত হননি, তবে আহত হয়েছিলেন ১৫ জন, ২০ মার্চ দুর্ঘটনায় দুজন ও ২২ জানুয়ারি বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ইজতেমাফেরত চারজন মুসল্লি নিহত হয়েছেন।

উল্লিখিত দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দ্রুতগতির যানবাহনের ওভারটেক, দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো, অদক্ষচালক ও ট্রাফিক আইন অমান্য করার কারণেই দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে। চালকদের অসাবধানতা ও অসতর্কতার কারণেও প্রতিনিয়ত মহাসড়কে মৃত্যুর পরিমাণ বাড়ছে। এসব দুর্ঘটনার পেছনের কারণ চিহ্নিত করে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের এই মৃত্যুর মিছিল থামানো যাবে না বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের এই পাঁচ কিলোমিটার জায়গাটিকে অনেক আগেই ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানে উচিত সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন রাখা। পুলিশ যদি এই সড়কে যান চলাচলের গতি নিয়ন্ত্রণ আনতে পারে, তাহলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। এ ছাড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বিশেষ করে চালকদের হাতেই সবকিছু। তারা যদি নিয়ন্ত্রণে ও সতর্কতার সঙ্গে যানবাহন চালান, তাহলে দুর্ঘটনাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু চালকরা অনেকটা অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠেছেন। কঠোর শাস্তি ছাড়া এদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়।’

এদিকে, মহাসড়কে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে হাইওয়ে পুলিশ তৎপর থাকার কথা থাকলেও তারা সেটি পালন না করার অভিযোগ রয়েছে বেশ আগে থেকেই। ওই সড়কের দুর্ঘটনার বিষয়গুলো সামাল দিতে হয় নগর পুলিশের দক্ষিণ সুরমা থানার। দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি খায়রুল ফজল বলেন, ‘দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সব সময় চেকপোস্ট করা হচ্ছে। সিগন্যাল দিয়ে যানবাহনের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া আর কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। দুর্ঘটনার বিষয়ে কেউ কোনো অভিযোগও দেয় না। কেউ মামলাও করে না।’ এমন অবস্থায় কাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবেÑ এমন প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল হাদী পাভেল বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ সড়কের ব্যাপারে চালকদের যদি প্রতিনিয়ত ব্রিফিং দেওয়া হয়, তাহলে এসব সড়কে দুর্ঘটনা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি প্রতিনিয়ত সচেতনামূলক প্রশিক্ষণও তাদের দেওয়া উচিত। কারণ সড়কে অনেকের সাংকেতিক চিহ্ন চালকরা বুঝেন না। এ ক্ষেত্রে এটি সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’

"