পশ্চিমাঞ্চল রেল রাজশাহী

দ্বিগুণ লাভ বেসরকারিতে অর্ধেক ক্ষতি সরকারিতে

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৯, ০০:০০

এস এইচ এম তরিকুল, রাজশাহী

বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে রাজশাহীর আওতায় পরিচালিত হয় ১৪২টি ট্রেনের মধ্যে মাত্র ৩৪টি ট্রেন পরিচালিত হচ্ছে লিজের মাধ্যমে বেসরকারিভাবে। এই বেসকারিভাবে পরিচালিত ট্রেনে বছরে লাভ হচ্ছে দ্বিগুণ, ১৫ কোটি টাকা। আর সরকারিভাবে পরিচালিত ট্রেনে বছরে লাভ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা, আর লোকসান তার অর্ধেক প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

রেলওয়ের দুর্নীতি, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের নামে অনিয়মের কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি বলে অভিমত সংশ্লিষ্ট দফতরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের। এ বিষয়ে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ কামনা করেন তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, এই দফতরের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই দুর্নীতিগ্রস্ত। তারা যখন যে সরকার থাকে তাদের সঙ্গে সংখ্যতা গড়ে তুলেই চলে। যে কারণে কোনো সরকারের সময়ই এ দফতরের লোকসান বন্ধে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। লোকসান বন্ধের নামে গৃহীত পদক্ষেপগুলো বাস্তব সম্মত নয়। এ বিষয়ে ইতিপূর্বেও অনেক লেখালেখি হলেও কোনো ফল আসেনি। বরং অভিযোগকারী কর্মকর্তাদেরই উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়।

এ সময় তারা প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, বেসরকারিভাবে পরিচালিত ট্রেনগুলোতে যদি বছরে কোটি কোটি টাকা লাভ হয়, তাহলে সরকার কর্তৃক পরিচালনায় কেন লোকসান হচ্ছে?

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে সূত্র মতে, রেলবিভাগের দুটি অঞ্চলের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চল রাজশাহীর আওতায় পরিচালিত ১৪২টি ট্রেনের মধ্যে আন্তঃনগর ট্রেন রয়েছে ৪৮টি, মেইল ট্রেন ৪৬টি, বিরতিহীন দুটি, আন্তর্জাতিক মৈত্রী এক্সপ্রেস চারটি ও লোকাল ট্রেন ৪২টি। এই ১৪২টির মধ্যে সরকারিভাবে পরিচালিত হচ্ছে ১০৮টি ও লিজের মাধ্যমে ৩৪টি। লিজের মাধ্যমে পরিচালিত অধিকাংশই লোকাল ও মেইল ট্রেন। যাত্রীদের ভাষায় এগুলো ট্রেন লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা। কিন্তু এই লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা ৩৪টি ট্রেনেই বছরে অন্তত ১৫ কোটি টাকা লাভ হচ্ছে। আর বাকি ১০৮টি রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত ট্রেনে লোকসান গুনতে হচ্ছে বছরে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার দফতর সূত্র মতে, এই বিভাগের আওতায় ১৪২টি ট্রেন থেকে গত বছরের জুলাই থেকে গত মে পর্যন্ত এই বিভাগের ট্রেনগুলো থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। লোকসান হয়েছে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। আগের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে চলতি জুন মাসে আরো প্রায় ৫০ কোটি টাকা আয় হবে। তবে আগের ধারাবাহিকতায় আরো প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি লোকসানও গুনতে হবে সরকারকে। সবমিলিয়ে বছরে প্রায় ৬০০ কোটি আয় হলে এর অর্ধেক লোকসান হয় রেল বিভাগে। তবে সম্প্রতি কিছুটা লোকসানের পরিমাণ কমতে শুরু হয়েছে উল্লেখ করে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার দফতরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বৃহৎ লোকসান কমিয়ে বেসরকারিভাবে পরিচালনার মতো লাভজনক করতে এখনো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

এই দফতর সূত্রে আরো জানা গেছে, লিজ দেওয়া মাত্র ৩৪টি ট্রেন থেকে মাসে রেল বিভাগের লাভ হয় ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার ৯১৪ টাকা। সেই হিসাবে বছরে ১৪ কোটি ৭০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৮ টাকা লাভ হচ্ছে পশ্চিমাঞ্চলের এই ট্রেনগুলো থেকে। আবার এই ৩৪টি ট্রেনে সবমিলিয়ে মাসে ২ কোটি ৩৯ লাখ ৭১ হাজার ১৯৭ টাকা আয় হলেও শুধু জ্বালানি বাবদ খরচ হচ্ছে ১ কোটি ২৫ লাখ ৭৬ হাজার ৮৪৯ টাকা। ফলে ৩৪টি ট্রেনে মোট আয় হচ্ছে বছরে প্রায় ২৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। আর অন্য ১০৮টি ট্রেনে বছরে আয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫০০ থেকে ৫৫০ কোটি টাকা। আর লোকসান গুনতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার মতো।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে রাজশাহীর অতিরিক্ত প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, লিজ দেওয়া ৩৪টি ট্রেন থেকে বছরে প্রায় অর্ধেক লাভ হচ্ছে। কিন্তু লিজ ছাড়া রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ১০৮টি ট্রেন থেকে বছরে প্রায় অর্ধেক বা তার কিছু টাকা বেশি লোকসান হচ্ছে। তবে ঠিক কত টাকা লোকসান হচ্ছে তার হিসাব রাখা হচ্ছে না। লোকসানের পরিমাণ রেল বিভাগ একত্রে করে থাকে।

এদিকে রেলওয়ের একাধিকও কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বিভিন্ন খাতে সীমাহীন দুর্নীতি, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের নামে লুটপাটের কারণেই প্রতি বছর পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েকে বিপুল পরিমাণ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। আবার টিকিট ছাড়া যাত্রীদের নিকট থেকে আদায়কৃত অর্থের বেশির ভাগই হচ্ছে ভাগ-বাটোয়ারা।

এ বিষয়ে রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাত খান গতকাল বুধবার দুপুরে প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘রেলওয়ে দফতরসহ সরকারের প্রতিটি বিভাগে কর্মরত সব পর্যায়ের ব্যক্তিদেরই দেশের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে মানবিক দায়বদ্ধতার মধ্যদিয়ে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে সরকারের প্রতিটি দফতরই লাভজনকে পরিণত হবে। একইসঙ্গে সরকারের দফতর পরিচালনাকারী জনপ্রতিনিধিদেরও সর্বক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করতে হবে। আর এমন পরিবর্তন ঘটাতে পারলে রেলের লোকসান হবে না। প্রকৃতপক্ষেই উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হবে আমাদের দেশ।’

"