সিলেটে সুস্থ শিশু জন্ম দিয়েছেন এইডস আক্রান্ত ৪৮ মা

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৯, ০০:০০

সিলেট প্রতিনিধি

সিলেটে গত কয়েক বছরে এইচআইভি পজেটিভ ৪৮ গর্ভবতী নারী ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের অধীনে চিকিৎসা নিয়ে এইচআইভি এইডস ভাইরাসমুক্ত ৫০ শিশুর জন্ম দিয়েছেন। এই মায়েরা বুকের দুধও পান করিয়েছেন তাদের নবজাতক সন্তানদের। জন্ম নেওয়া সব শিশুই এখন সুস্থ আছে। তথ্য মতে, সিলেটের ৪টি বিভাগে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৯৩০ জন এইচআইভি এইডস পজেটিভ রয়েছেন। গত এক বছরে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৭১ জন।

জানা গেছে, এইডস আক্রান্ত মায়েদের সন্তান যেন এইডস নিয়ে জন্ম না নেয়, সে লক্ষ্যে ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এইডস, এসটিডি প্রোগ্রাম এবং ইউনিসেফের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় পিএমটিসিটি প্রোগ্রামের মাধ্যমে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

এই প্রোগ্রামের অধীনে এখন পর্যন্ত সিলেট বিভাগের চার জেলায় এইচআইভি আক্রান্ত ৪৮ জন প্রসূতি মা ৫০ জন সুস্থ সন্তান জন্ম দিয়েছেন। বর্তমানে ৫১ জন নারী গর্ভাবস্থায় রয়েছেন। গত দেড় যুগে সিলেটে এইচআইভি এইডস আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৭ শিশু ও ৬৮ নারীর। আর এ রোগে আক্রান্ত হয়ে এখন চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন ৪৮ শিশু ও ২৩২ জন নারী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভি শনাক্ত করে ভাইরোলজি বিভাগ। ২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত এ দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। একই বছর থেকে ইউনিসেফের সহায়তায় ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু হয়। পিএমটিসিটি প্রোগ্রামের সঙ্গে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কয়েক বছর আগে চালু হয়েছে এআরটি সেন্টার।

ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এইডস রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি করানো হয় এইচআইভি পরীক্ষা। রয়েছে নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও। গত ৯ এপ্রিল মৌলভীবাজারে একটি সেবা কেন্দ্র চালু হয়েছে। যেখানে বর্তমানে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার ১১০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন।

এদিকে এইচআইভি এইডস নিয়ে দেড় যুগ ধরে কাজ করছে ‘আশার আলো সোসাইটি’ নামের একটি এনজিও সংস্থা। আরো অনেক এনজিও সংস্থা সিলেটে এইডস নিয়ে জনসচেতনামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এইচআইভি আক্রান্ত মায়েরাও সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে পারছেন। কারণ এখন ওষুধ বের হয়েছে। যখনই মায়ের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়, তখনই মাকে সেই ওষুধ দেওয়া হয়। এতে করে বাচ্চা সুস্থ থাকে। বাচ্চাটির যেন এইচআইভি না হয়, সে জন্য বাচ্চাকেও এন্টি ভাইরাস ইনজেকশন দিতে হয়।

তারা আরো জানান, এইডস আক্রান্ত মাও চাইলে সন্তান জন্ম দিতে পারেন। তবে সে জন্য কিছু ওষুধ আছে। এইচআইভি পজিটিভ বা এইডস আক্রান্ত মা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে কি নাÑ এটি নিয়ে অনেক ধরনের মত রয়েছে। প্রথম কথা হচ্ছে, বাচ্চাকে মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে। না খাওয়ালে শিশু ডায়রিয়া, পুষ্টিহীনতাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। শিশুর মৃত্যুও হতে পারে। তবে মায়ের বুকে যেন কোনো ক্ষত না থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তথ্য মতে, সিলেটের ৪টি বিভাগে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৯৩০ জনের এইচআইভি এইডস পজেটিভ রয়েছে। গত এক বছরে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৭১ জন।

তথ্য মতে, সিলেটে সবচেয়ে বেশি এইডস রোগী রয়েছে। এইডস রোগীর বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্যফেরত। তার মধ্যে সৌদি আরব, কুয়েত ও দুবাইফেরত বেশি। দক্ষিণ আফ্রিকা ও আশপাশের দেশ ফেরত কিছু রোগীও রয়েছে। তাদের কাছ থেকে তাদের স্ত্রীরাও আক্রান্ত হচ্ছে এ রোগে। এ ক্ষেত্রে বিদেশফেরত প্রবাসীদের নিয়মিত চেকআপ করা গেলে সিলেটে এইচআইভি এইডসের ঝুঁকি কমে যেত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এইচআইভি আক্রান্ত একাধিক নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গর্ভবতী হওয়ার পর চিকিৎসকদের পরামর্শ নেন তারা। তাদের পরামর্শ মতো সন্তানেরও জন্ম হয়। এখন সন্তান সম্পূর্ণ সুস্থ। কোনো সমস্যা নেই। এমনকি যারাই এআরবি ওষুধ খাচ্ছে, তারা সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছে।

ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওই প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোতাহার হোসাইন জানান, ওসমানীর পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রে আসা গর্ভবতী মায়েদেরও কাউন্সেলিং করে এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। পজেটিভ পাওয়া গেলে পিএমটিসিটির অধীনে প্রসূতি মায়ের চিকিৎসা চলে। নিয়মিত চিকিৎসা নিয়ে এরই মধ্যে এইচআইভি পজেটিভ ৪৮ জন প্রসূতি মা সুস্থ বাচ্চা জন্ম দিয়েছেন। এটা অনেক বড় সাফল্য। এ ছাড়া বিভিন্ন এনজিও সংস্থা থেকে পজেটিভ রোগীদের পাঠানো হয় হাসপাতালে। পজেটেভ রোগীদের সেবার আওতায় এনে নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিসক ও পিএমটিসিটি প্রোগ্রামের ফোকাল পার্সন ডা. আবু নঈম মোহাম্মদ বলেন, সিলেটে দিন দিন এইচআইভি এইডস আক্রান্ত রোগী বেড়েই চলেছে। বিদেশফেরত প্রবাসীরাই এই রোগ দেশে নিয়ে আসছে। তাদের মাধ্যমে পরিবারে রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে বিদেশফেরত প্রবাসীদের দেশে প্রবেশের পরই চেকআপ করা প্রয়োজন।

 

 

"