ধনী-গরিব এক কাতারে

প্রকাশ | ১৯ মে ২০১৯, ০০:০০

তুহিন আহমদ, মহানগর (সিলেট)

ঘড়ির কাঁটাতে সময় তখন বিকেল ৬টা। গরিব-ফকির-মিসকিন থেকে ধনী কোটিপতি, সবাই এক কাতারে বসে আছেন। কারো মধ্যে কোনো দ্বিধা সংকোচ নেই। সবাই দোয়া-দরুদ পড়ছেন। ঠিক এ সময় স্বেচ্ছাসেবীরা ইফতারির প্লেট এগিয়ে দিচ্ছেন। প্রথম রোজার দিন থেকেই এই দৃশ্য দেখা মিলবে সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজারে। প্রথম দিন থেকেই মুসাফিরদের সাহ্রি ও ইফতার করানো হয়। এই ঐতিহ্য চলছে প্রায় ৭০০ বছর ধরে।

গতকাল শনিবার মাজারে গিয়ে দেখা যায় ইফতারের জন্য ছিল খেজুর, জিলাপি, পেঁয়াজু ও খিচুড়ি। বিকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাজারে জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এমনকি দেশের অন্যান্য জায়গা থেকেও এসেছেন অনেকে।

রাজধানী ঢাকা থেকে দরগাহ মাজারে এসেছেন পায়েল আফরোজ। তিনি বলেন, আমরা চারজন এসেছি ঢাকা থেকে। এবারই প্রথম এসেছি এই মাজারে। বাবার মাজারের এই ইফতারের সুনাম অনেক আগেই শুনেছি। ভেদাভেদ ভুলে সবার সঙ্গে এক কাতারে ইফতারের প্রশান্তির অনুভূতি নেওয়ার জন্যই এবার চলে এসেছি।

অতীতের মতো এবারও প্রথম রমজান থেকে শাহজালাল (রহ.) এর মাজারে মুসাফিরদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে সাহ্রি ও ইফতারের। সাহ্রিতে খাওয়ানো হয় ভাত-তরকারি অথবা খিচুড়ি। ইফতারে খাওয়ানো হয় খেজুর, জিলাপি, পেঁয়াজি, খিচুড়ি অথবা আখনি।

নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা স্থান রয়েছে মাজারে। মাজারের লঙ্গরখানার পাশেই মুসাফিরখানায় নিচতলায় নারী মুসাফিররা। দ্বিতীয়তলায় পুরুষ মুসাফিররা বসে ইফতার করেন। নারীদের সংখ্যা বেশি হলে দ্বিতীয়তলার একটি কক্ষে বসার ব্যবস্থা করা হয়।

মাজারের লঙ্গরখানায় ইফতারের রান্নার আয়োজন শুরু হয় দুপুর থেকে। গতকাল শনিবার মাজারের লঙ্গরখানায় গিয়ে দেখা যায়, পাঁচটি চুলায় আগুন দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন মহিলা সবজি কাটছেন ও শিলপাটায় মশলা বাটছেন। বাবুর্চি পঞ্চাশোর্ধ্ব ইদ্রিস মিয়া। তিনি সহকারীদের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। আলাপ হয় ইদ্রিস মিয়ার সঙ্গে।

ইদ্রিস মিয়া জানান, প্রায় ৩৫ বছর ধরে শাহজালাল (রহ.) এর মাজারে রান্নার কাজ করছেন। মানিক মিয়া নামে আরেকজন প্রধান বাবুার্চিও আছেন। রমজান মাসজুড়ে মাজারের ইফতার ও সাহ্রির আয়োজন দুজনই নেতৃত্ব দেন। তাদের সহকারী আছেন প্রায় ১২ জন।

ইদ্রিস মিয়া বলেন, ইফতারে থাকে ভুনা খিচুড়ি, ছোলা, খেজুর, জিলাপি ও পেঁয়াজু। প্রতিদিন এ রকম খাবার দেওয়া হয় না। মাঝে মাঝে অনেকে ফল, মাংস দিয়ে যান। তখন খাবার পরিবর্তন করা হয়। সাহ্রিতে নিয়মিত খাবার ভাত, মাছ বা মাংস থাকে। মাঝে মাঝে খিচুড়িও দেওয়া হয়।

ইদ্রিস মিয়ার সহকারী বাচ্চু মিয়া বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে মাজারে রান্নার কাজ করছি। কিন্তু রমজান মাসে মুসাফিরদের জন্য রান্না করে অন্য রকম শান্তি পাই। বাচ্চু মিয়া জানান, ইফতার সবার মধ্যে বণ্টন করে দেওয়ার জন্য প্রায় ১০ জন স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন। যারা ইফতার পরিবেশন করেন।

নগরের আম্বরখানা এলাকা বাসিন্দা মনি বেগম তার সন্তানকে নিয়ে এসেছিলেন মাজার জিয়ারত করতে। ইফতারের সময় মেয়েকে নিয়ে মুসাফিরখানায় প্রবেশ করেন। মনি বেগম বলেন, চাইলে আমি পাশের রেস্তোরাঁতে ইফতার করতে পারতাম। কিন্তু দরগাহে বসে সবার সঙ্গে ইফতার করার সুযোগ সব সময় আসে না তাই এখানে ইফতার করতে এসেছি।

তিনি আরো বলেন, ধনী, গরিব সবার জন্যই রোজা সমান। তাই শুধু রোজা রাখলেই হবে না। আমাদের মন মানসিকতাকেও পরিবর্তন করতে হবে।

এ ব্যাপারে হজরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়ার ভক্তরা নামক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. মকন মিয়া বলেন, রমজানে মুসাফিরদের ইফতার করানো মাজারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ মানুষ দরগাহ ইফতার করেন। বৃহস্পতিবারে এই সংখ্যা প্রায় ৫০০ ছাড়িয়ে যায়। সাহ্রিতে কোনো দিন ১০০, কোনোদিন ৮০ জন মানুষ খাবার খান। মানুষকে তৃপ্তির সহিত খাওয়ানোর জন্য আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করি।

 

"