রাজশাহী খাদ্য আদালত

৩ বছরেও হয়নি কোনো মামলা

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৯, ০০:০০

এইচ এম তরিকুল, রাজশাহী

খাদ্যে ভেজাল ঠেকাতে ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর প্রণীত হয় ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’। ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আইনটি কার্যকর হয়। এরপর ওই বছরের ৩০ জুন এক প্রজ্ঞাপনে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিচার বিভাগ জেলার জন্য ১ নম্বর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজেস্ট্রেট আদালত ও মহানগর এলাকার জন্য ২ নম্বর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে ‘বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত’ হিসেবে নির্ধারণ করে। কিন্তু আইন কার্যকরের ৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এসব আদালতে কোনো মামলা নেই।

এ তথ্য নিশ্চিত করে রাজশাহী জেলা ও দায়রা জজ মীর শফিকুল আলম বলেছেন, ‘মামলা না হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে এ বিষয়ে শুধু ভোক্তারাই নয়, আইন প্রয়োগকারী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বিষয়টি সম্পর্কে সেভাবে অবগত নন। যার ফলে নিরাপদ খাদ্য আইন কার্যকরের তিন বছরেও রাজশাহীতে এ আইনে একটি মামলাও হয়নি। তার মানে আমরা নিরাপদ খাদ্য পাচ্ছি অথবা ভেজাল খাবারই খাচ্ছিÑ বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু বাজারের প্রকৃত অবস্থাটা কী তা জানা দরকার।

আইন সহজলভ্য করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই আইনের আশ্রয় নেয়ার ক্ষেত্রে ভোক্তাদের সচেতনতার অভাব রয়েছে। তাছাড়া এই আইনে মামলা করাটাও খুবই সময়োপযোগী বিষয়। বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে ঝামেলা ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া রয়ে গেছে। কেননা আইনটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে একাধিক কর্তৃপক্ষ জড়িত। সব এক জায়গায় এনে একটা ফোরাম করা গেলে আইনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা যাবে। কারণ বিচারটা হতে হবে খুব সংক্ষিপ্ত।’

এই বিচারক বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না এর প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনে আইন সহজলভ্য করতে হবে। সেবা নিতে গিয়ে বিভিন্ন দুয়ারে ঘুরতে হলে মানুষ হয়রানির শিকার হবে। তখন কেউ আর সহসায় আইনের আশ্রয় নিতে চাইবে না। এর দায় কিন্তু আমাদের। সুতরাং আমরা যারা বিচারের দায়িত্বে আছি তারা আইনটি প্রয়োগ করতে পারি।

নিরাপদ খাদ্য আইনের ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর কথা উল্লেখ করে বিচারক মীর শফিকুল আলম বলেন, দৃষ্টিনন্দন ও লোভনীয় খাবার মানুষকে আকর্ষণ করে। বাজারে রঙ মেশানো জিলাপি থাকলে সেটিই বেশি বিক্রি হয়। কিন্তু রঙ মেশানো জিলাপি নিরাপদ নয়, এটা অনেকেই ভুলে যায়। তাই এ ব্যাপারে মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করা যায়। মোট কথা, আইনটা সহজলভ্য করতে হবে। তাহলে মানুষ দেখতে পাবে নিরাপদ খাদ্য আইন আছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের এতে সাজা হচ্ছে। তখন এ আইনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে।

তিনি আরো বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাওয়ার পথে দেখি রাস্তার ধারে চোখের সামনে কাঁচা টমেটোতে স্প্রে করা হচ্ছে। তারপর সেগুলো পরিপক্ব আকার ধারণ করে লাল টকটকে হয়ে যাচ্ছে। কই এ বিষয়ে নিরাপদ খাদ্য আইনে একটা মামলাও তো হয়নি। কিন্তু আইনটার বিচার সংক্ষিপ্ত করা গেলে এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি পেত। তাই এটা করতে হবে। আর এজন্য সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কেননা মানুষের জন্যই আইন। সেটি মানুষের হাতের মুঠোয় নিয়ে যেতে হবে। তাহলে এই যে, একটা মামলাও হয়নিÑ বিষয়টি আর এমন থাকবে না।

নিরাপদ খাদ্য আইনের ৬৬ ধারার উদ্ধৃতি দিয়ে বিচারক বলেন, ‘খাদ্য ক্রেতা ভোক্তাসহ যেকোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন নিরাপদ খাদ্যবিরোধী কাজ সম্পর্কে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান অথবা তার কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা পরিদর্শকের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ জানাতে পারবে। তারা অভিযোগ পাওয়ার পর অনুসন্ধান ও পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে অপরাধের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হলে খাদ্য আদালতে মামলা করবেন।’

বিচারক বলেন, ‘বর্তমানে দেশে ৭২৫ জন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করছেন। তারাই নিরাপদ খাদ্য আইনের মামলার বাদী হবেন। কিন্তু এ আইন কার্যকরের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও রাজশাহীতে কোনো মামলা হয়নি।’

এ বিষয়ে রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. কাজী মিজানুর রহমান বলেন, ‘জীবন ও স্বাস্থ্যরক্ষায় আইনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে সিভিল সার্জন হিসেবে নতুন যোগ দেয়ায় বিষয়টি সম্পর্কে আগে জানতাম না। এখন থেকে আইনটি কার্যকরের ব্যাপারে আমার করণীয় বিষয়গুলো দেখভাল করব।’

বিএসটিআই রাজশাহী কার্যালয়ের উপপরিচালক খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘ওজন ও পরিমাপ মানদ- আইন-২০১৮ এবং বিএসটিআই আইন-২০১৮ অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা নেন। গত তিন মাসে বিভাগের আট জেলায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ২০০টি মামলা করেছেন।’

"