বছরজুড়ে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি

সমন্বয় নেই সেবা সংস্থাগুলোর

প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

তাজুল ইসলাম পলাশ, চট্টগ্রাম ব্যুরো

সাইড পাইপলাইন স্থাপনের নামে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। নগরীর মেইন সড়ক ছাড়াও গলিপথগুলো পর্যন্ত খোঁড়া শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের কোপ থেকে রেহাই পাচ্ছে না সম্প্রতি কার্পেটিং হওয়া সড়কগুলোও। এতে বর্ষায় ভোগান্তি বাড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নগরবাসী বলছে, এমন কোনো সড়ক নেই ওয়াসার কোপ পড়ছে না। সড়কে চলাচলের মতো অবস্থা নেই। কদিন পরপর এমন নতুন নতুন প্রকল্পের নামে ভালো রাস্তাগুলো নষ্ট করায় ক্ষোভ জানান তারা।

নগরবিদরা বলছেন, উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলো ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত হওয়ায় একমাত্র ইউটিলিটি করিডোরই পারে দুর্ভোগের হাত থেকে জনগণকে মুক্তি দিতে। আলাদা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক দাতা সংস্থার প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। তাই উন্নত বিশ্বের মতো সড়কের পাশে আলাদা ইউটিলিটি করিডোর তৈরি করতে পারলে জনদুর্ভোগ যেমন কমবে, রোধ হবে অর্থের অপচয়ও। তবে এসব খোঁড়াখুঁড়ির অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। ওয়াসা নগরীতে ৬৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের কাজ করছে। রাত-দিন চলছে খোঁড়াখুঁড়ি।

অভিযোগ উঠেছে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিয়ে। তাদের মধ্যে নেই কোনো সমন্বয়। তাই একটি সড়ক একেকবার একেক সংস্থা খুঁড়ছে। তাতে সবচেয়ে বেশি রাস্তা কাটে ওয়াসা। তথ্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের অধীনস্ত ১১০০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ১৩ কিলোমিটারই কাটার অনুমতি নিয়েছে ওয়াসা। অর্থাৎ কোনো কোনো সড়কের দুপাশই কাটার অনুমতি নিয়েছে তারা, যা চলবে ২০২২ সাল পর্যন্ত। কমাস আগে নতুন পানি শোধনাগারের পাইপলাইন স্থাপনের নামে নগর জুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি করেছিল ওয়াসা। আর এবার বসানো হচ্ছে সাইড পাইপলাইন। শুধু তাই নয়, প্রতি বছর চট্টগ্রাম নগরীতে সেবা সংস্থাগুলোর উন্নয়নের নামে সড়ক কাটা হয় ১০০ কিলোমিটারের মতো, যা মেরামতে ব্যয় হয় ৩৫ কোটি টাকা। এতে নষ্ট হয় সরকারি অর্থের। এমন বাস্তবতায় উন্নত দেশের আদলে সড়কে ইউটিলিটি করিডোর বা ডাক্টলাইন স্থাপনের পরামর্শ নগর বিশেষজ্ঞদের।

অন্যদিকে চসিকের উন্নয়নকাজ চলছে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পোর্ট কানেক্টিং রোড আগ্রাবাদ অ্যাকসেস রোড ও শাহ আমানত সেতু সংযোগ সড়কে। অথচ তিন সড়কেরই উন্নয়নকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল গত বছর। সময় শেষ হয়ে গেলেও এখনো কাজ বাকি আছে ৬০ শতাংশ। ফলে আসন্ন বর্ষায় দুর্ভোগ বাড়বে এতে কোনো সন্দেহ নেই। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের জন্য তিন সড়কই দুর্গম হয়ে উঠেছে। বর্ষার আগে এসব সড়কের কোনোটিরই কাজ শেষ হবে না। এ জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলাকে দায়ী করছেন তারা।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ বলেন, নগরীতে ৭০০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের কাজ করছি। পাইপের কারণে বহু এলাকায় পানি দেওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য সংকট ঘুচাতে আমাদের পাইপলাইনের কাজ করতে হচ্ছে। পাল্টাতে হচ্ছে অনেকগুলো পাইপ। আগামীতে নগরবাসীর আর কষ্ট হবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগের মতো রাস্তা কাটা হচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী ইয়াকুব সিরাজউদ্দৌলা প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, ২০১২ সাল পর্যন্ত আমাদের নতুন পাইপ স্থাপনের সময়সীমা আছে। এরই মধ্যে আমাদের ৮০ শতাশ কাজ শেষ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সড়ক ঠিক করে দেওয়া আমাদের কাজ নয়। এটা সিটি করপোরেশন দেখবে। আমরা তাদের টাকা দিয়ে দিয়েছি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ‘সিটি গভর্ন্যান্স প্রজেক্টের (ব্যাচ-২)’ আওতায় জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে আগ্রাবাদ অ্যাকসেস রোডের উন্নয়ন করা হচ্ছে। ৪৮ কোটি ৯৬ লাখ ৬৬ হাজার ৮৪৮ টাকা ব্যয়ে ২ দশমিক ২০ কিলোমিটার এ উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করছে মেসার্স রয়েল অ্যাসোসিয়েটস। উদ্বোধনের সময় চসিক মেয়র গত বর্ষার আগেই সড়কটির উন্নয়নকাজ শেষ করার ঘোষণা দিয়েছিল।

সময়মতো কাজ না হওয়ায় টিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করলেন চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক আবু সালেহ। তিনি বলেন, ওই প্রকল্পের কার্যাদেশ ছিল ৩৬৫ দিনের। কিন্তু ওই সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় আরো এক বছর সময় বাড়ানো হয়। আসন্ন বর্ষার আগে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ নাছির উদ্দিন বলেন, ঢাকার পর চট্টগ্রাম শহর। এসব শহরে ডাক্টলাইন স্থাপনের কথা চলছে। সব ইউটিলিটি করিডোর সার্ভিসগুলো সেখানে থাকবে। তখন আর সমস্যা হবে না।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিয়মানুযায়ী প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কারের জন্য ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ করা হয় সিটি করপোরেশনকে। কিন্তু টেন্ডারসহ আমলাতান্ত্রিক ও আইনি জটিলতায় দীর্ঘায়িত হয় সংস্কারকাজ। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে সংস্কারের দায়িত্ব দিলে জনদুর্ভোগ অনেকটাই কমবে। এদিকে এসব উন্নয়নকাজে সৃষ্টি হচ্ছে যানজটও। নগর ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মানুষের সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির সংখ্যাও বাড়ছে। সেই মতে সড়ক নেই। সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির কারণে অধিকাংশ সড়ক নষ্ট হচ্ছে। এতে যান চলাচলের ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ পড়ছে অন্য সড়কে। এ কারণে কোনো না কোনো জায়গায় যানজট হচ্ছে। আমাদেরও পড়তে হচ্ছে বেকায়দায়।

 

"