শোধন ছাড়াই রাজশাহীতে ‘সুপেয় পানি’ ওয়াসার!

প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

এস এইচ এম তরিকুল, রাজশাহী

রাজশাহী নগরীতে পানি শোধনাগারের রয়েছে ৫টি। এর মধ্যে পদ্মার পানিনির্ভর শ্যামপুরের একমাত্র ভূ-উপরিস্থ শোধনাগারটি বছরে মাত্র ৪ মাস সচল থাকে। বাকি চারটি ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগার পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পর থেকে রয়েছে বিকল। এই অবস্থায় ৯৬টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে সরাসরি ভূ-গর্ভস্থ পানি সরবরাহ করছে ওয়াসা। নগরবাসীর জন্য উন্নত পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) পানি সরবরাহ বিভাগ ভেঙে আলাদাভাবে যাত্রা শুরু করা ওয়াসা গত আট বছরে লক্ষ্য পূরণে সফল হয়নি বলে মনে করেন নগরবাসী।

শোধন ছাড়াই বছরের পর বছর নগরবাসীকে সুপেয় (!) পানি সরবরাহ করছে বলে দাবি ওয়াসার। কিন্তু নগরবাসী জানিয়েছেন, এসব সরবরাহকৃত পানি পানযোগ্য নয়। দুর্গন্ধের কারণে গোসল করাসহ পোশাক পরিষ্কারের জন্যও ব্যবহার করা যায় না। অনেক সময় মানুষের মলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৫ লাখ ৫১ হাজার ৬৩০ জন অধিবাসীর এই শহরে ওয়াসার পানি সরবরাহের আওতায় এসেছে ৪ লাখ ৪ হাজার ২১০ জন গ্রাহক। শতকরা হিসাবে পানির কাভারেজ ৭৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। আওতা শত ভাগে উন্নীত করতে কাজ করছে বলে দাবি সংস্থাটির। এখন ওয়াসার গ্রাহক ৪২ হাজার ৬৮০। সব মিলে প্রতিদিন পানির চাহিদা ১১ দশমিক ৩৩ কোটি লিটার। কিন্তু উৎপাদিত হচ্ছে ৭ দশমিক ৭৮ কোটি লিটার। এর ৯৬ শতাংশই আসছে ভূগর্ভ থেকে। জনপ্রতি দৈনিক ১৯০ দশমিক ৭৪ লিটার পানি উৎপাদন হলেও ব্যবহার হচ্ছে ১২৬ দশমিক ৩০ লিটার।

নগরজুড়ে ওয়াসার পানি সরবরাহ লাইন রয়েছে ৭১২ দশমিক ৫০ কিলোমিটার। দৈনিক ৫ দশমিক ১০ কোটি লিটার পানি বিক্রি করছে ওয়াসা। সংস্থাটি দিনে ১২ ঘণ্টা পানি সরবরাহ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২০১১ রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) পানি সরবরাহ বিভাগ ভেঙে ওয়াসার আলাদা যাত্রা শুরু। নগরবাসী মনে করেন, গত আট বছরে লক্ষ্য পূরণে সফল হয়নি সংস্থাটি। নগরীর ডিঙ্গাডোবা এলাকার বাসিন্দা আইনজীবী বাবু বলেন, ‘ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি পানযোগ্য নয়, বিশেষ করে সকালের শুরুর পানিটা ডোবা-নালার চেয়েও নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। ময়লা ছাড়াও পানিতে থাকে প্রচুর আয়রন। পাত্রে সংরক্ষণ করলে লাল স্তর পড়ে যায়। ফুটিয়ে পান করতে গিয়ে দেখা যায় নিচে সাদা স্তর। এ পানি যাদের ফুটিয়ে পান করার ব্যবস্থা নেই তারাই মূলত ডায়রিয়াসহ পেটের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।’

নগরীর রানীনগর এলাকার গৃহবধূ সাঈদা রায়হানা বলেন, ‘এই পানি কেবল রান্নাবান্না ও ধোয়া-মোছার কাজে লাগে। ওয়াসার পানিতে গোসল করাও যায় না। এক টানা ১০ দিন গোসল করলে চুল নষ্ট হয়ে যায়।’ এছাড়াও বিমানবন্দর রোড, সপুরা থেকেও কালো, দুর্গন্ধযুক্ত পানি সরবরাহের অভিযোগ আছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কথা বলতে রাজি হননি ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুলতান আবদুল হামিদ। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংস্থাটির এক শীর্ষ কর্মকর্তার দাবি, ‘দক্ষিণ এশিয়ার স্ট্যান্ডার্ড বিবেচনায় রাজশাহী ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি বিশুদ্ধ। অনেকেই না ফুটিয়েই এই পানি পান করেন। অনেকেই উত্তোলনকালে গভীর নলকূপ থেকে পানি নিয়ে গিয়ে পান করেন। নিজস্ব পরীক্ষায় ওয়াসার পানিতে পানিবাহিত রোগবালাইয়ের জীবাণু মেলেনি।’

তথ্যটির সঙ্গে একমত পোষণ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের আঞ্চলিক গবেষণাগারের সিনিয়র কেমিস্ট শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আলাদা করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়নি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে তারা যে পরীক্ষা চালিয়েছেন তাতে পানিতে তেমন রোগবালাইয়ের জীবাণু মেলেনি। পানির গুণগত মানেরও তেমন পরিবর্তন হয়নি।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, ‘মূলত ত্রুটিপূর্ণ সংগ্রহ, শোধন ও সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে ওয়াসার পানি সুপেয় হচ্ছে না। এটি সাধারণ বিষয়। তবে সরবরাহ লাইন সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করা গেলে এবং রাসায়নিকভাবে শোধন না করলে বিপদ দ্বিগুণ হবে।’

ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১১ অক্টোবর ৪ হাজার ৬২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। ওই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পদ্মার পানি শোধন করে রাজশাহী নগরী ও এর আশপাশের পৌর এলাকায় সরবরাহ হবে। এই শোধনাগারে প্রতিদিন ২০ কোটি লিটার পানি শোধন হবে। পরিশোধিত পানি সরবরাহে গড়ে তোলা হবে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এর মধ্যে প্রধান সরবরাহ লাইন থাকবে ২৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার। এছাড়া ৪৮ কিলোমিটার প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি সরবরাহ লাইনও থাকবে। ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনাগার নির্মাণ হবে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে। এরই মধ্যে ৫৩ দশমিক ৩১ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চলতি বছরের জুনের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হবে।

 

"