বিলিয়ন ডলার রফতানিসহ লক্ষাধিক কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা

বলিরহাটে হতে পারে কাঠের ‘শিল্পপল্লী’

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, চট্টগ্রাম ব্যুরো

ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে সরকার অতি সম্প্রতি চট্টগ্রামের মিরসরাই ও আনোয়ারায় বিশেষ অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করলেও চট্টগ্রামের বলিরহাটের কাঠের তৈরি ফার্নিচার শিল্পটি উপেক্ষিত থেকে গেছে। বলিরহাটের রফতানিযোগ্য এ ফার্নিচার শিল্প খাতকে লক্ষ্যমাত্রার আওতায় এনে কোটি কোটি ডলার আয় করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। নগরীর বহদ্দারহাট থেকে পূর্বদিকে খাজা রোড হয়ে কিছু পথ গেলেই রাস্তার দুপাশের অলিগলিতে চোখে পড়বে কাঠের ওপর তৈরি নিত্যনতুন নকশার ফার্নিচারের সারি সারি দোকান।ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী এখানে নজরকাড়া আকর্ষণীয় ডিজাইনে ফার্নিচারের ওপর নিত্যনতুন নকশার কারুকাজ করে যাচ্ছেন শত শত শ্রমিক, কারিগর।

সরেজমিন গিয়ে জানা গেল, সেখানে বর্তমানে সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি ফার্নিচারের দোকান ও শোরুম রয়েছে। আর এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ৪০ হাজারের বেশি মানুষ। নকশাযুক্ত কাঠের ফার্নিচারের জন্য প্রসিদ্ধ এ বলিরহাটে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বলিরহাটের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে কেউ না কেউ মালয়েশিয়া অথবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাঠের শ্রমিক কিংবা কারিগর হিসেবে কর্মরত। এ অঞ্চলকে মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশের মতো বিশেষ কাঠ শিল্পপল্লী হিসেবে গড়ে তোলা গেলে প্রতি বছর এ বলিরহাট থেকেই এক বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা কঠিন কিছু নয়।

স্থানীয় অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এখানকার শ্রমিক কারিগরদের আরো উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা এ অঞ্চলকে একটি বিশেষ কাঠশিল্প পল্লীতে রূপান্তর করে এটিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস হিসেবে ভেবে দেখার সময় এখনই। এখানকার কর্মরত শ্রমিকদের উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে দক্ষ মানবসম্পদ রফতানি করেও কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন।

এক সাম্প্রতিক হিসেবে দেখা গেছে, বিশ্বের অন্যতম প্রধান কাঠ ও কাঠের তৈরি ফার্নিচার রফতানিকারক দেশ মালয়েশিয়া কাঠ ও কাঠের তৈরি ফার্নিচার রফতানি করে বছরে প্রায় ৪ বিলিয়নের বেশি ডলার আয় করছে।

মালয়েশিয়া টিম্বার ইন্ডাস্ট্রি বোর্ডের তথ্যমতে, তারা চলতি বছর ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ধরে রেখেছে। দেশটিতে কাঠ ও ফার্নিচার শিল্পে জড়িত রয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজারের মতো শ্রমিক। সেখানে এ শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে তিন হাজার পাঁচশ’ কারখানা।

বলিরহাট ফার্নিচার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী মোহাম্মদ জসিমউদ্দিন প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, ‘দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, যুগ যুগ ধরে চট্টগ্রামের এই বলির হাটের নকশাযুক্ত ফার্নিচার দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করে আসছে। এখানকার কাঠের দক্ষ কারিগর ও শ্রমিকরা মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে ইতিমধ্যে গিয়ে সুনাম কুড়িয়েছে। অথচ চট্টগ্রামের এ সম্ভাবনাময় শিল্পটি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত।’

তিনি বলেন, ‘সরকার সম্প্রতি চট্টগ্রামের মিরসরাইতে শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠা তথা বিশেষ ইকোনমিক জোন করার উদ্যোগ নিয়েছে এটা প্রশংসাযোগ্য উদ্যোগ বহু লোকের কর্মসংস্থান হবে সেখানে।’

বলিরহাট ফার্নিচার ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি মুজিবুর রহমানও একই বক্তব্য পোষণ করে প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের বহু সম্ভাবনাময় এ কাঠের তৈরি ফার্নিচার শিল্পের দিকে সরকারের দৃষ্টি দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। বর্তমানে অর্ধলক্ষ লোক বলিরহাটের নকশাযুক্ত কাঠের ফার্নিচার শিল্পের সঙ্গে জড়িত। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের মত এ শিল্পটি থেকে কোটি কোটি ডলারের ফার্নিচার রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আমরা আয় করতে পারি।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্থানীয় ১৮নং পূর্ব বাকলিয়ার ওয়ার্ড কাউন্সিলর হারুন অর রশীদ বলেন, বহু দিনের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা বলিরহাটের কাঠের ফার্নিচার শিল্পকে সম্প্রসারণ করে এখানে ‘কাঠশিল্প পল্লী’ স্থাপনের মাধ্যমে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানে এক সম্ভাবনাময় সুযোগ আছে এখানে। সরকার কর্তৃক এ শিল্পটির দিকে নজর দেওয়ার উপযুক্ত সময় এখনই।’

কাঠশিল্পের প্রধান কাঁচামাল বিদেশ থেকে কাঠ আমদানির নির্ভরযোগ্যতা কমাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা ও পার্শ্ববর্তী মিরসরাই, ফটিকছড়ি প্রভৃতি অঞ্চলে গাছ রোপণ করে কাঠ উৎপাদনের নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি করা যেতে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালক মুহসীন কবির খান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, চট্টগ্রামের বলিরহাটে একটি ‘কাঠ শিল্পপল্লী’ গড়ে ওঠা সম্ভব। তিনি শীগগিরই সেখানে যাবেন এবং এ ব্যাপারে সকল সহযোগিতার কথাও জানালেন তিনি।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বলিরহাটের এ ফার্নিচার শিল্পকে বিশেষ জোনের আওতায় এনে ‘ শিল্পপল্লী’ হিসেবে চিহ্নিত করে এখানকার আগে থেকে নিয়োজিত কারিগর, শ্রমিকদেও আরো উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনবল তৈরি করে লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থানের খাত সৃষ্টি করার এখনই উপযুক্ত সময়। কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাময় এ খাতটির দিকে সরকার এগিয়ে আসবেÑ এমনটিই প্রত্যাশা এতদঞ্চলের মানুষের।

"