কর্মসংস্থান তৈরি করছেন মাস্টার সুকুমার

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

আসাফুর রহমান কাজল, খুলনা

হাত ধরে হাঁটার আগেই বাবা মারা গেছেন। অন্যের জমিতে কাজ করে মা চালিয়েছেন সংসার। সেই সময় মায়ের কাছ থেকে ১৫ টাকা নিয়ে শহরে আসেন তিনি। ৪র্থ শ্রেণিতে পড়াকালীন কাঠমিস্ত্রি, মিলের কাজ, রিকশা চালানো আর দর্জির কাজ করে চালিয়েছে নিজের খরচ। আজ তার হাতে হয়েছে ২৫০ নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান।

খুলনার ডুমুরিয়া আরশনগরের ঋষি সম্প্রদায়ের (দলিত জনগোষ্ঠী) সুকুমার দাস। থাকেন দৌলতপুর ঋষিপাড়ায়। তার বাবা যখন মারা যায় তখন তিনি কেবল হাঁটতে শিখছেন। অভাবের সংসারে বাবার রেখে যাওয়া ২৯ শতক জমি রাখা হয় বন্ধক। তারপর মা অন্যের জমিতে জোন দিয়ে সংসার চালাত। মিশনের স্কুল থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া শেখা হয়। পড়ালেখার ইচ্ছায় মায়ের কাছ থেকে ১৫ টাকা নিয়ে খুলনার দৌলতপুর ঋষিপাড়ায় বোনের বাসায় আসে। কিন্তু সেখানে এসে আর পড়ালেখা হয়নি। সবার চাপে সেই বয়সে তাকে করতে কাঠমিস্ত্রির কাজ। কিছুদিন সেই কাজ করে সপ্তাহে আয় হতো ১০ থেকে ১৫ টাকা। পরে মিলের কাজ কিছুদিন করে শুরু করেন রিকশা চালানো। প্রথম দিনে আয় হয় ১৪ টাকা। যা দিতে হয় রিকশার ভাড়া।

পরের দিনে থেকে প্রতিদিন যা আয় হয় তা দিতে হতো বোনের বাড়িতে। এভাবে কিছুদিন কাটার পর একবেলা রিকশা চালানো আর একবেলা চলে দর্জির কাজ শেখা। কয়েক বছর দর্জি কাজ শেখা হলে ১৯৯৫ সালে তার মাসিক বেতন হয় ১০০ টাকা। ভালোভাবে কাজ শেখার জন্য দর্জি মাস্টারের বাড়ির কাজ, গোসলের পানি চেপে দেওয়াসহ প্রায় সব কাজই করে দিতেন। কাজ শেখার পাশাপাশি রাতে বাসায় ফিরে এলাকার মানুষের কাজের অর্ডার নিতে শুরু করেন। শত পরিশ্রমের পরও নিজের জমানো টাকা এবং বোনের কাছ থেকে কিছু ধার নিয়ে কেনেন পুরোনো সেলাই মেশিন। ভাড়া নেন মাসিক ৭০ টাকা দিয়ে একটি ঘর। সেখানেই চলে দর্জির কাজ।

এলাকার ঘুরে ঘুরে নেয় কাজের অর্ডার। এলাকার বেকার ছেলেমেয়েদের ডেকে নিয়ে আসে কাজ শেখাতে। এই শিক্ষার্থীরা কিছুটা কাজ শিখলেই তাদেরও দিতেন মজুরি। এভাবে তার কাছে আসতে শুরু করে বিভিন্ন এলাকার বেকার তরুণ-তরুণী। প্রত্যেকের জন্য তৈরি করেন আলাদা খাতা। সেখানে লেখা হয় তাদের আয়ের হিসাব।

সরেজমিন দেখা যায়, কাপড় কাটা শিখছেন পূর্ণিমা, অঞ্জনা। তাদের প্রত্যেকের সংসার রয়েছে। সংসারের আয় বাড়াতে অন্যেদের মতো তারাও এখানে কাজ শেখেন। সংসারের কাজ শেষ করে তারা প্রতিদিন এখানে আসেন। পূর্ণিমা কয়েক মাস কাজ শিখে এখন প্রতিটি কাজে মজুরি পায় আর অঞ্জনা কেবল সেলাই শিখছে।

পূর্ণিমা জানান, শুধু এ এলাকা নয়। আশপাশের এলাকার অনেক দর্জিই এনার (সুকুমার) কাছ থেকে কাজ শিখেছেন। তারা এখন বড় বড় দোকান চালায়। আমি ছয় মাসের মধ্যে আয় শুরু করেছি। অনেক জামা-কাপড় কাটা এবং সেলাইয়ের কাজও শিখে গেছি। সুকুমার দা বেকার আর অভাবীদের ডেকে এনে কাজ শেখায়। কোনো অহংকার করে না।

অঞ্জনা জানান, এলাকার অনেককে দেখেছি। তারা এখন আয় করছে। সংসারের অভাব মেটাতে পারছে। আমি তাদের দেখে উৎসাহিত হয়েছি। দাদা প্রতিটা কাজ, মাপ বুঝিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে কাটিং এবং সেলাইও শেখায়।

মাস্টার সুকুমার দাস জানান, অভাব কাকে বলে তা জানি। মায়ের দেয়া ১৫ টাকা নিয়ে শহরে এসেছিলাম। মাকে বলে এসেছিলাম, মানুষ হতে পারলে ফিরব। ভালো লাগে, আজ ২৫০ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পেরেছি। এখন তারা এক একটি পরিবার চালাচ্ছে। আমার মায়ের বন্ধকী জমি ছাড়িয়ে নিয়েছি। গ্রামে তালপাতার ঘর ভেঙে টিনের ঘর তুলেছি।

লেখাপড়া শেখার ইচ্ছা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তারপরও আমাকে সবাই মাস্টার বলে ডাকে। আমার সংসার হয়েছে, সন্তান হয়েছে। স্ত্রী অনার্স পড়ছে আর সন্তান ক্লাস ওয়ানে। নিজে সৎ হলে এবং ইচ্ছা থাকলে কেউ তাকে আটকে রাখতে পারে না। পেছনের দিনগুলো মনে পড়লে আজও গা শিউরে ওঠে। এখন ভালো আছি।

 

"