স্থানান্তর হচ্ছে না শিশুপার্ক চলছে আধুনিকায়ন

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক
ama ami

মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থান রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক পাশে অবস্থিত শিশুপার্কটি স্থানান্তর করা হচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এ স্থানটি সংরক্ষণ করতে দীর্ঘদিন ধরে পার্কটি স্থানান্তরের কথা জানানো হলেও সে উদ্যোগ থেকে সরে এসেছে সরকার। বরং পার্কটির আধুনিকায়নে ২৬৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ‘ঢাকাস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এ কাজ শেষ করা হবে। এ প্রকল্পে শুধু পার্কের অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য ৭৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। এরই মধ্যে পার্কটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে উন্নয়নকাজ শুরু করা হয়েছে। সরেজমিনে ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এর আগে ২০১৫ সালের ৩ জানুয়ারি, সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আ ক ম মোজাম্মেল হক ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য ২৬ মার্চের মধ্যে রাজধানীর শাহবাগ থেকে শিশুপার্ক স্থানান্তর করা হবে। পরে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী নাকচ করে দেন। পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সঙ্গে একীভূত করে পার্কটির আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, পার্কে ঘুরতে আসা শিশুরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গ্লাস টাওয়ার দেখে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে। প্রকল্পে শিশুপার্কের পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সৌন্দর্য বৃদ্ধির বিষয়টি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। গ্লাস টাওয়ারের দৃষ্টিসীমায় যেন বিঘœ না ঘটে সে কথা মাথায় রেখে স্থাপনা নির্মাণ করা হবে।

এরই মধ্যে পার্কের উন্নয়নকাজ শুরু হয়েছে। পার্কে নতুন রাইড বসিয়ে দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নিচে তৈরি হবে ভূ-গর্ভস্থ ৫০০টি গাড়ি রাখার পার্কিং। নির্মাণ করা হবে পার্ক ও উদ্যান মিলিয়ে কয়েকটি ফুড কোর্ট। এ ছাড়া দৃষ্টিনন্দন জলাধারসহ হাঁটার পথ, দর্শনার্থীদের জন্য বসার স্থান, আন্ডারপাস, মসজিদসহ আনুষঙ্গিক স্থাপনা নির্মাণ করা হবে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রণীত এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে গণপূর্ত অধিদফতর। শিশুপার্কের আধুনিকায়নের দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এ জন্য সংস্থাটিকে মূল বরাদ্দ ২৬৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা থেকে ৭৮ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এ থেকে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করার জন্য কনসালট্যান্সি ফি বাবদ এক কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। পাঁচ কোটি টাকা রাখা হয়েছে পুরনো স্থাপনা অপসারণ ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে। বাকি ৭৩ কোটি টাকা ব্যয় হবে ১৩টি ইকুয়েপমেন্ট ও আন্ডার গ্রাউন্ড পার্কিং নির্মাণে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ পর্যন্ত। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিডেট (এনডিই) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে শিশু-কিশোরদের জন্য গড়ে ওঠা সরকারি এই বিনোদন কেন্দ্রটির সবগুলো রাইডই মেয়াদোত্তীর্ণ। ৩৯ বছরের পুরনো এসব রাইডের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২৯ বছর আগে। ফলে ঝুঁকি নিয়েই এসবে চড়ছে শিশুরা। পার্কের পরিবেশও ভালো নয়। তা সত্ত্বেও শিশুদের অন্যতম আকর্ষণ এই পার্কে ভিড় লেগেই থাকে। রাইডগুলোয় ওঠার পর আতঙ্কে থাকেন অভিভাবকরা। বিষয়টি চিন্তা করে এ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শাহবাগসংলগ্ন অংশে ১৫ একর জায়গায় গড়ে ওঠা পার্কটির ভিস্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ১৯৭৮ সালের ২৩ নভেম্বর। পরের বছরের ১১ জুলাই পার্কটি খুলে দেওয়া হয় শিশুদের জন্য। সে সময় পার্কের রাইডগুলো জাপানের মিশো করপোরেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করে।

জানা গেছে, শুরুতে পার্কে রাইডের সংখ্যা ছিল ১৪। তবে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আর্চারি, বেবি সাইকেল ও স্কেটিং রাইড বাদ দেওয়া হয়। বর্তমানে সচল ১১ রাইড হলো রোমাঞ্চ চক্র, আনন্দ ঘূর্ণি, এসো গাড়ি চড়ি, উড়ন্ত বিমান, উড়ন্ত নভোযান, ফুলদানি আমেজ, ঝুলন্ত চেয়ার, লম্ফঝম্ফ, এফ-৬ জঙ্গিবিমান, রেলগাড়ি ও বিস্ময় চক্র। এর মধ্যে এফ-৬ ফাইটার জেট জঙ্গিবিমানটি ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সহায়তায় স্থাপন করা হয়। সম্প্রতি পার্কটিতে গিয়ে এর প্রধান ফটক বন্ধ দেখা গেছে। ভেতরে চলছে উন্নয়নকাজ। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উন্নয়নকাজ চলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য পার্কটি বন্ধ থাকবে। নানা ঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতার পরও প্রতিদিন পার্কটিতে গড়ে সাত হাজার দর্শনার্থী আসত। এ থেকে বছরে সিটি করপোরেশনের আয় হয় সাড়ে চার কোটি টাকা। আধুনিকায়নের পর দর্শনার্থী বাড়ার পাশাপাশি আয়ও বাড়বে।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক সার্কেল) আনিছুর রহমান বলেন, ‘শিশুপার্ক স্থানান্তর করা হচ্ছে না বরং আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। পার্কের রাইডগুলো অনেক পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ জন্য সরকার একে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।’

"