নতুন দায়িত্ব ‘চ্যালেঞ্জ’ মনে করছেন আবদুল মোমেন

প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

ছিলেন সফল কূটনীতিক। স্থান পেয়েছেন সরকারের নতুন মন্ত্রিসভায়। ব্যক্তিগতভাবেও তিনি একজন হেভিওয়েট মন্ত্রীর ভাই। তারপরও নতুন পাওয়া দায়িত্বকে বেশ চ্যালেঞ্জ মনে করেছেন শেখ হাসিনার নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে যাওয়া জাতিসংঘ বাংলাদেশ মিশনের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত এবং সর্বোপরি একজন বৈশ্বিক যোগাযোগসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ড. এ কে আবদুল মোমেন।

গত সোমবার শপথ নেওয়ার পর তিনি বলেন, ‘আমার ওপর আস্থা রাখায় রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার কাছে আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। সেই সঙ্গে অত্যন্ত আনন্দিতও। তবে আমাদের সামনে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, জনগণ বিপুল ভোটে আমাদের বিজয়ী করিয়েছে। সুতরাং তাদের প্রত্যাশাও অনেক বড়। এজন্য আমাদের দায়-দায়িত্বও অনেক বেড়েছে।’

ড. মোমেন বলেন, এই বিরাট দায়-দায়িত্বের ভার নিয়ে মানুষের এই প্রত্যাশাও কীভাবে চরিতার্থ করতে পারি, কীভাবে সেটা অর্জন করব, কীভাবে মানুষের সেই প্রত্যাশা পূর্ণ করবÑ সেটাই আমাদের তালিকার প্রথমে থাকবে। নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ড. মোমেন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী অনেকগুলো রূপরেখা দিয়েছেন। রূপখো-২০২১, রূপখো-২০৩০, রূপখো-২০৪১। তা ছাড়া রয়েছে শতবর্ষের পরিকল্পনা ডেল্টাপ্ল্যান। এগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করব, সে নিয়ে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ আছে। সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়নে সঠিক প্ল্যান করতে হবে।’

তবে সব কাজে দেশবাসীর সহায়তা চেয়ে তিনি বলেন, ‘দেশবাসীর সমর্থন ছাড়া এগুলো ত্বরান্বিত করা যাবে না। তাই আমাদের প্রত্যাশা, সব সময় আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন।’

ড. এ কে আবদুল মোমেন শেখ হাসিনার নতুন মন্ত্রিসভায় বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন। তার পাশাপাশি এ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন এম শাহরিয়ার আলম। বিদায়ী অর্থমন্ত্রী এম এ মুহিতের ছোট ভাই ড. মোমেন গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচিত হন। নির্বাচনের আগেই রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দেওয়ায় তার বড় ভাই মুহিতের আসন থেকেই এবার নির্বাচিত হন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় (ম্যাসাচুসেটসের বোস্টন) থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করা আবদুল মোমেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ সালে অর্থনীতিতে বিএ এবং ১৯৭১ সালে উন্নয়ন অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৭৯ সালে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ পাস করেন। পাশাপাশি ঢাকার সেন্ট্রাল ল’ কলেজ থেকে আইনশাস্ত্রে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।

২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ড. মোমেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এ দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ সর্বোচ্চসংখ্যক শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর মর্যাদা লাভ করেন। এ ছাড়া সময়ই বাংলাদেশ থেকে প্রথম নারী শান্তিরক্ষী, নেভাল ফোর্স পাঠানো হয়। জাতিসংঘের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমুদ্র বিজয়, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ক্ষতিপূরণের দাবি, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন ড. এ কে আবদুল মোমেন।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রকল্পে অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। সৌদি আরবে কর্মরত অবস্থায় তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে অনাকাক্সিক্ষত শিশুশ্রম, শিশুকে জঙ্গি হিসেবে ব্যবহার এবং শিশু যৌনকর্মী ব্যবহারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ড. এ কে আবদুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দুই যুগ শিক্ষকতা করেছেন। বাংলাদেশের নারী ও শিশু পাচার বন্ধে বিশ্বজুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন তিনি। ফলে ১৯৯২ সালে মুম্বাই থেকে ২৫টি শিশু এবং পাকিস্তান থেকে অসংখ্য মেয়েকে ফিরিয়ে আনা হয়। নারী ও শিশু পাচার বন্ধ, অপ্রাপ্ত বয়স্ক নারীদের খতনা, শিশুদের উটের জকি বন্ধকরণসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলেন তিনি। ড. মোমেনের বলিষ্ঠ ভূমিকায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার ১৯৯৪ সালে দুটি বিল পাস করে। ড. মোমেনের এ উদ্যোগ বিশ্ব মিডিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অনুপ্রেরণা জোগান।

ড. মোমেন বোস্টনের ‘উইম্যান অ্যান্ড চিলড্রেন’ মানবিক প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। সিনেটর কেনেডির পত্র নিয়ে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নারী ও শিশু পাচার বন্ধ ও ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের জন্য তহবিল গড়ার আহ্বান জানান তিনি। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত মানবকল্যাণে অবদানের জন্য মার্কিন পত্রিকা ঈগল ট্রাইবুন ‘হোম টাউন হিরো’, মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ‘হিউমেনিটারিয়ান অ্যাওয়ার্ড,’ ও নিউইয়র্কের প্রবাসী সংস্থা ‘ফ্রেন্ডস অব দি পুওর’ উপাধিতে তাকে ভূষিত করে।

ড. মোমেন ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে কয়েক কোটি টাকার সরঞ্জামের ব্যবস্থা করে দেন। এ ছাড়া সন্দ্বীপে স্কুল কাম শেল্টার সেন্টার স্থাপনে ৭৫ হাজার মার্কিন ডলার দানে প্রধান ভূমিকা রাখেন। ঢাকার মহিলা পরিষদের আবাসিক, গ্রামীণ ব্যাংকের ফান্ড, ব্র্যাকের বিভিন্ন সেবা কাজে, ঢাকা মেট্রোপলিটন লায়ন্স ক্লাবকে শিক্ষা ও চক্ষু প্রজেক্ট বাস্তবায়ন, গাজীপুরে কিশোরী মেয়েদের সেবা হোমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাহায্য সহযোগিতা করেন। তাকে বিশ্বের অনেক সংস্থা, অনেক ব্যক্তি বিভিন্ন সম্মাননা প্রদান করে।

কর্মজীবনের শুরুতেই স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজীর একান্ত সচিব হিসেবে বাংলাদেশের ওয়েজ আর্নার স্কিম চালু করেন। এটি বঙ্গবন্ধু সরকারের উল্লেখযোগ্য অবদান। অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের একান্ত সচিব থাকা অবস্থায় অনেক ঝক্কি-ঝামেলা মোকাবিলা করে দেশের চা-বাগানগুলো ব্যক্তি মালিকানায় দেওয়ায় ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৮৮-৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্সিয়াল পদপ্রার্থী মাইকেল ডুকাকিসের উপদেষ্টা ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবাসীদের ‘মহাসম্মেলন বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং বোস্টনে ফোবানার তৃতীয় মহাসম্মেলনে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন আবদুল মোমেন। বাংলাদেশের প্রত্যেক গণতান্ত্রিক দল একযোগে যখন স্বৈরাচার এরশাদ সরকার হঠাও আন্দোলন করে আশানুরূপ ফল পাচ্ছিল না, তখন ড. মোমেন ১৯৮৮ সালে ইউএস কংগ্রেসে এরশাদ সরকারের ওপর এক শুনানির আয়োজন করেন। ফলে এরশাদের পতনের সূচনা ঘটে।

ড. মোমেনের প্রচেষ্টায় ১৯৮৯ সালে ইউএস কংগ্রেসে বন্যার ওপর একটি শুনানি হয়। ফলে বাংলাদেশের জন্য ১৫০ মিলিয়ন ডলার সাহায্য বরাদ্দ হয়। ১৮৮৯ সালে ‘ম্যাসাচুচেস্ট সিনেট’ গভর্নর ড. মোমেনের বাংলার মানুষ ও মানবতার কাজের জন্য ‘আম্বাসাডর অব গুডউইল’ উপাধি দেন।

১৯৯০ সালে বাংলাদেশে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা হলে আমেরিকার বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠানে ড. মোমেনের বক্তব্যে ৪৫ হাজার মার্কিন ডলার সাহায্য সংগ্রহ করে দেশে পাঠানো হয়। এ ছাড়া ‘ম্যাসাচুচেস্ট সিনেট’ বাংলাদেশে অধিক সাহায্য পাঠানোর প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং জর্জ বুশ বাংলাদেশে মেরিনদের সাহায্যদাতা হিসেবে পাঠায়। ১৯৯০ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে বাংলাদেশের ব্যাপক ক্ষতি হলে তিনি অনেক শ্রম, অনেক চেষ্টা, অনেক তদবিরের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ মওকুফ করান। এ ছাড়া বিল ক্লিনটন সরকারকে দিয়ে আরো ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ মওকুফ করান। শুধু তাই নয়; আরো ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ মওকুফের জন্য তৎকালীন এরশাদ সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আবেদনের অনুরোধ করেন।

 

"