পোড়া ইটের উৎপাদন বন্ধ না হলে খাদ্য সংকট দেখা দেবে

‘পোড়া ইটের বিকল্প কংক্রিট ব্লক’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘পোড়া ইটের বিকল্প কংক্রিটের ব্লক’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, ইট তৈরি করতে দেশের কৃষি জমির টপ সয়েল (মাটির উপরিভাগ) কেটে ফেলা হচ্ছে। এতে জমির উৎপাদনশীলতা কমছে। একইসঙ্গে কাঠ বা কয়লা পুড়িয়ে ইট তৈরির কারণে পরিবেশও মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। পোড়া ইটের ব্যবহার বন্ধ না করা হলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ভয়াবহ পরিবেশ ও খাদ্য সংকট সৃষ্টি করবে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে পোড়া ইটের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।

তারা আরো বলেন, পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশসহ উন্নত দেশগুলো বহু আগ থেকে পোড়া ইট তৈরি নিষিদ্ধ করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে টপ সয়েলের ব্যবহার বন্ধের মাধ্যমে পোড়া ইট তৈরি নিষিদ্ধ করেছে। কেননা, টপ সয়েল ছাড়া পোড়া ইট তৈরি করা যায় না। এ কারণে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধভাবে পোড়া ইট পাচার হচ্ছে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম-বাংলাদেশের (সিডিজেএফবি) আয়োজনে ‘পোড়া ইটের বিকল্প কংক্রিট ব্লক’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সংগঠনের সভাপতি অমিতোষ পালের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মতিন আবদুল্লাহর সঞ্চালনায় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ রেডিমিক্স কংক্রিট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়াল। অন্যদের মধ্যে সেমিনারের আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান, প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ ম. ইনামুল হক, কংক্রিট ব্লক বিশেষজ্ঞ মো. আবু সাদেক, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উপনগর পরিকল্পনাবিদ হাসিবুল কবির, সাংস্কৃতিক কর্মী মনোরঞ্জন ঘোষাল, পরিবেশ কর্মী তুষার রেহমান, সিনিয়র সাংবাদিক তৌফিক আলী প্রমুখ। এ সেমিনারের সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড ও আবাসন নিউজ২৪ডটকম।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ ও কৃষি জমি রক্ষা করতে আগামী ২০২০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ইটভাটা তুলে দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, আমিও টপ সয়েল ব্যবহারের বিপক্ষে। জমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করে যেভাবে ইট তৈরি করা হচ্ছে তাতে কৃষি জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী বলেন, ইটের খোয়ায় নির্মিত সড়কের স্থায়িত্ব অনেক কম। কোথাও ইটের খোয়া দিয়ে সড়ক করলে দেখা যায় ৬ মাসের মধ্যে সেগুলো গলে যাচ্ছে অথবা গুঁড়া হয়ে যাচ্ছে। আর কংক্রিটের ব্লক দিয়ে সড়ক করলে তার স্থায়িত্ব দীর্ঘ হয়। এ কারণে সড়কের টেকসইয়ের জন্য ইটের খোয়ার পরিবর্তে পাথরের খোয়া ব্যবহারের চিন্তা করতে হবে। তবে দেশে পোড়া ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিটের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে পাথর আমদানিতে শুল্ক সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। অন্যথায় মানুষ পাথর ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হবে।

কংক্রিট ব্লক বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার আবু সাদেক বলেন, দেশে নিবন্ধিত ইটভাটার সংখ্যা ৭ হাজার ৯০০টি। আর নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে দেশে মোট ইটভাটার সংখ্যা ৪৫ হাজার। নানা কারণে প্রতি বছর দেশে শতকরা ১ ভাগ কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের তথ্য মতে, ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ জমি ইটভাটার কারণে কমছে। আর ৮০ ভাগ জমি কমছে অপরিকল্পিত আবাসনের কারণে।

প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ ম. ইনামুল হক বলেন, দেশে ইটভাটার কারণে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। এছাড়া স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। ইটভাটা বন্ধে কংক্রিট ব্লক ব্যবহারে উপকারিতা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। তাহলে মানুষ সচেতন হবে এবং কংক্রিট ব্লক ব্যবহারে উৎসাহিত হবে। তবে সেজন্য সংশ্লিষ্টদের পোড়া ইটের সঙ্গে কংক্রিট ব্লকের তুলনামূলক চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। লাভ ক্ষতির গবেষণাধর্মী চিত্র তুলে ধরলে মানুষ কংক্রিট ব্যবহারে উৎসাহিত হবেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নে ইটভাটা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। এ ইটভাটার ফলে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইটভাটার বিকল্প ব্যবহার শুরু করতে হবে। ২০২০ সালের মধ্যে পোড়া ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান এই পরিকল্পনাবিদ।

বাংলাদেশ রেডমিক্স কংক্রিট অ্যাসোসিয়েশনের প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়াল মূল প্রবন্ধে সরকারের কাছে পাঁচ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ১. অবিলম্বে সব সরকারি ও আধা সরকারি ভবনে পোড়া ইটের ব্যবহার বন্ধ করা ২. ২০২০ সালের পর ঢাকাসহ সব বিভাগীয় শহরে ভবন নির্মাণের ইট ব্যবহার বন্ধ করা ৩. ২০২২ সালের পর দেশের সব জেলা শহরে ভবন নির্মাণে পোড়া ইটের ব্যবহার বন্ধ করা ৪. ২০২৫ সালের পর সব উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ভবন নির্মাণে পোড়া ইটের ব্যবহার বন্ধ করা এবং ৫. পোড়া ইটের বিকল্প যেকোনো ধরনের ব্লক তৈরির ফ্যাক্টরিকে ন্যূনতম ১০ বছরের জন্য সব ধরনের ট্যাক্স ও ভ্যাটের আওতামুক্ত ঘোষণা করা।

"