ঢাকার সড়কে নিয়ম মানেন না কেউ

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

সড়কে আগের মতো নৈরাজ্য চলছেই। রাজধানীর সড়কে উল্টোপথে চলা, যত্রতত্র পার্কিং, গাড়িতে রেশারেশি, যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ হয়নি। পুরনো গাড়ি রং করে সড়কে নামাচ্ছে মালিকরা। লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় চালক তাদের গাড়ি চালানোর কারণে অনেককেই জরিমানা করেছে ট্রাফিক পুলিশ। মামলাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সড়কে নিয়ম মানেন না কেউ।

রাজধানীর মিরপুর সড়কের ধানমন্ডি এলাকায় প্রাইভেট কারের লাগামহীন যত্রতত্র পার্কিং এবং চলাচলের কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের।

ধানমন্ডির সোবহানবাগ এলাকায় এ সমস্যা আরো প্রকট। সোবহানবাগ মসজিদের সামনে পদচারী-সেতুর নিচে ব্যক্তিগত গাড়ির লাগামহীন পার্কিং নিয়মিত চিত্র। এতে এ এলাকায় যানজট লেগেই থাকে। অন্যদিকে, পথচারীদের পদচারী-সেতু ব্যবহারে অনীহাও দেখা যায়। অল্প দূরত্বে পদচারী-সেতু থাকলেও ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ত সড়ক পার হন নগরবাসী।

ফার্মগেট এবং বাংলামোটর, শাহবাগ এলাকায় দেখা যায়, বাস স্টপেজ না থাকার পরও যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা হচ্ছে। অনেক মোটরসাইকেলের চালক হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেল চালাচ্ছে। পথচারী সেতু থাকলেও মধ্য রাস্তা দিয়ে পার হচ্ছে। হাত উঁচিয়ে পথচারীরা চলন্ত গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। চালকরা যানবাহন চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। আগের মতোই চলছে সড়কে বিশৃঙ্খলা।

তবে পুলিশের দাবি, ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করার কারণে ঢাকাসহ দেশের সকল সড়কে আগের তুলনায় অনেক শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। বিভিন্ন পরিবহন তথা গাড়ির ড্রাইভার ও জনগণের মাঝে ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেসসহ অন্যান্য কাগজপত্র সম্পর্কে অধিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড প্লানিং) মো. সোহেল রানা জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করায় সারা দেশে সাধারণ মানুষ পুলিশকে সমর্থন জুগিয়েছেন।

বিআরটিএ এবং পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, একেকটি বাণিজ্যিক যানবাহনে তিন চালকের প্রয়োজনে। ব্যক্তিগত গাড়িতেও একাধিক চালক দরকার। কারণ মোটরযান আইন অনুসারে পেশাদার চালক দিনে সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা যানবাহন চালাতে পারবেন। টানা ৫ ঘণ্টার বেশি চালানো যাবে না। অর্থাৎ সব মিলিয়ে যানবাহন যত আছে, এর চেয়ে বৈধ লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা। এটি না থাকায় অদক্ষ ও ভুয়া চালকরাও যানবাহন চালাচ্ছেন।

এক হিসাব মতে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৭৪ টি। নিহত হয়েছে ১৬৭ জন। প্রতি মাসে ঢাকা মহানগরীতে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে মারা যায় ২৪ জন। বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ জন। আর আহত হয় অনেক বেশি। আহতদের কথা তো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আলোচনায় আসেই না।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে যত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে তার প্রায় ২০ শতাংশ ঘটে খোদ এই রাজধানীতেই। আমরা স্বীকার করি বা না করি, ঢাকা মহানগরীর সড়কগুলো কিন্তু দিনকে দিন বিপজ্জনক হয়ে পড়ছে। গত ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে চালকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় প্রাণ হারায় দিয়া ও রাজীব নামের দুই শিক্ষার্থী। আহত হয় ৯ জন। এ ঘটনার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। টানা ৯ দিন আন্দোলনের পর সরকারের আশ্বাসে শ্রেণিকক্ষে ফিরে গেছে তারা। কিন্তু সড়কে কাক্সিক্ষত শৃঙ্খলা ফেরেনি।

সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়েছে। সংসদে পাস হলেই সেটি আইনে পরিণত হবে। বাস চলাচলের অনুমোদন প্রক্রিয়ার সংস্কারের দাবি এই আইনে উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহলের অনেকেই সমালোচনা করেছেন। দাবি ছিল ‘রুট ফ্রান্সাইজ’ পদ্ধতির। এই পদ্ধতিতে সব বাস-মিনিবাস কয়েকটি কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসা হয় এবং কেন্দ্রীয়ভাবে সেটা পরিচালনা করা হয়। মালিকরা সবাই এর অধীনে বাস চালাবেন এবং বিনিয়োগ অনুসারে মুনাফা পাবেন। চালকরা পাবেন নিয়োগপত্র। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক এই ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। গুলশানে ‘ঢাকা চাকা’ পরিবহন এই পদ্ধতিতে চলছে বলেই সেখানে চালকদের মধ্যে পাল্লাপাল্লি নেই।

বিআরটিএর তথ্য মতে, রাজধানীতে ২৪৬টি কোম্পানির অধীনে বাস চলে ৮ হাজারের মতো। বাস মালিকের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার।

সূত্র জানায়, প্রভাবশালী অনেকেই নিজে কোম্পানি খোলার পর দুই-একটি বাস কেনেন, তারপর অন্যদের কাছ থেকে ভাড়ায় বাস নিয়ে রুটে চালানো শুরু করেন।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকের অভিমত হলো, ‘বাস ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হলে অবশ্যই ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। আর সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকর করে মোড় দিয়ে পথচারীদের সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা করতে হবে। মোড় দিয়ে পথচারীরা সড়ক পারাপার হবেন, এটাই প্রচলিত ও বৈজ্ঞানিক নিয়ম।’

 

"