এখনো সড়কে ফেরেনি শৃঙ্খলা

প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

রাজধানীর সড়কে এখনো শৃঙ্খলা ফেরেনি। গণপরিবহনে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করায় যেমন যানজট বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। এ ছাড়া গণপরিবহনের স্বল্পতা, ভিআইপিদের নিয়ম না মানার প্রবণতাসহ আরো সমস্যা রয়েছে রাজধানীর সড়কে। সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক দাবির আন্দোলনের পরও সড়কে সুশৃঙ্খল নিয়মের অভাব আর এতে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে সড়কে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে দরকার পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেই শৃঙ্খলা ফিরে আসতে পারে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছায়। তবে বাস মালিক সমিতি বলছে, পর্যাপ্ত বাস স্টপেজ না থাকায় চালকরা যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করাতে বাধ্য হচ্ছে।

এদিকে, সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় রাজধানীর যান চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ যাত্রীদের। বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপে দীর্ঘমেয়াদি সুফল না আসায় পরিবহন খাতটি জনবান্ধব হতে পারেনি বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। তারা মনে করেন, আইন মানার সংস্কৃতি চালু করার পাশাপাশি সকলের সচেতনতাই পারে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সাফল্য আনতে। ডিএমপির দাবি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় সড়ককে নিরাপদ করতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এর সুফল পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী তারা।

রাজধানীর গণপরিবহন মানেই নানা ভোগান্তি আর অব্যবস্থাপনা নিয়ে পথ চলা। যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানামা, লেন না মেনে চলাচল, বেপরোয়া গতি, পারস্পরিক প্রতিযোগিতা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ পরিবহনগুলোর বিরুদ্ধে। আইন না মেনে পথ চলে মোটর সাইকেলসহ অন্যান্য পরিবহনও। সাধারণ যাত্রীরা মনে করেন রাজধানীতে গণপরিবহন কম থাকার সুযোগে এবং আইনের প্রয়োগ না থাকায় হয়রানি ও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন তারা।

যাত্রীরা বলছেন, গাড়ি চলতে গেলে ড্রাইভিং লাইসেন্সের কোনো বিকল্প নেই। ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে ড্রাইভারই কিসের। এত আন্দোলন হওয়ার পরও সড়কের শৃঙ্খলায় কোনো উন্নতি নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় না আসায় পরিবহনগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হচ্ছে না। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ট্রাফিক সপ্তাহ পালন, এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে জেল-জরিমানাতেও কাজ হয় না।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সালেহ উদ্দিন বলেন, মালিক এবং চালক জনগণ সবাই যদি সহযোগিতা করে তাহলে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব। সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বলব, আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে এবার আপনাদের দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা মহানগর পুলিশ জানায়, সম্প্রতি সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। চলন্ত পরিবহনের দরজা বন্ধ রাখা, বাসচালক ও সহকারীদের পরিচয়পত্র প্রদর্শন, অনির্ধারিত জায়গায় যাত্রী ওঠানামা বন্ধের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে। ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ১২০টা স্টপেজ আছে এর বাইরে কোথাও বাস না দাঁড়ায় সে জন্য মালিক-শ্রমিকদের সহযোগিতা লাগবে। ৬টি কোম্পানির মাধ্যমে ঢাকা শহরে বাস চলবে। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের তত্ত্বাবধানে আমরা এই কাজটি করব।

কর্তৃপক্ষ জানান, ট্রাফিক সপ্তাহের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে হবে ক্যামেরা স্থাপন, সংকেত ব্যবস্থার উন্নয়ন, ফুটওভার ব্রিজের আশপাশে উঁচু বেষ্টনী নির্মাণ, সড়ক বিভাজক উঁচুকরণ, জেব্রা ক্রসিং দৃশ্যমানসহ অন্যান্য নির্দেশনাও।

রাজধানীর ফার্মগেট। চলন্ত বাস থেকে টলোমলো পায়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে পথে নামলেন রফিকুল ইসলাম। কেন ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন, জানতে চাইলে সহজ স্বীকারোক্তিতে দায় চাপালেন চালক হেলপারের ওপর। তিনি জানালেন, ‘আমি নামতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু ওরা প্যাসেঞ্জার পাওয়ার জন্য নামতে বলেছিল। এ জন্য আমি নেমে এসেছি।’ রাজধানীতে এমন চিত্র দেখা যায় হরহামেশাই। আর যাত্রীদের ক্ষোভ বাধ্য হয়েই জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে তাদের। এক যাত্রী বলেন, দুর্ঘটনা ঘটতে পারে আমার মাথায় ছিল না। নামতে হবে তাই যেকোনোভাবে আমি নেমে গেছি।’ তবে চালকরা বলছেন ভিন্ন কথা। বাস স্টপেজে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলতে দেন না খোদ ট্রাফিক পুলিশ। তাই তারাও বাধ্য হচ্ছে যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানামা করতে।

যাত্রী ও চালক একে অপরকে দোষারোপ করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছে, রুট পারমিট দেওয়ার পদ্ধতিতে ত্রুটির কারণেই নিয়ম নীতি মানছে না কেউ। পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, যারা রুট পারমিট দেয় তারা একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করে যাত্রী ধরার একটা প্লানিং করেছে। সবাইকে যদি এক ছাতার নিচে নিয়ে এসে এক রঙের বাস যদি দেওয়া যায়, দিনের শেষে যদি যারা যার শেয়ার নেওয়া যায় এবং চালককে ব্যবসা করতে না দিয়ে তাকে যদি বেতনভুক্ত করা যায় তাহলে একটা দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখা যাবে।

এদিকে, যাত্রী নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার কথা স্বীকার করে বাস মালিক সমিতি বলছে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সমিতির চেয়ারম্যান সোহেল তালুকদার বলেন, অ্যাসোসিয়েশন থেকে স্পষ্টভাবে বলেছি, কোনোভাবেই চুক্তিতে গাড়ি চালানো যাবে না। আমরা আশাবাদী এতে কিছু হলেও কাজ হবে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ছয় মাসে সারা দেশে মোট সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ২ হাজার ৮৬০টি। এর মধ্যে নিহত হন ৩ হাজার ২৬ জন এবং আহতের সংখ্যা ৮ হাজার ৫২০ । দিনের পর দিন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বাড়লেও কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না সড়কে এ মৃত্যুর মিছিল।

"