উন্মুক্ত জলাশয়গুলো যেন মৃত্যুফাঁদ

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর বেশিরভাগ উন্মুক্ত জলাশয় এখন শিশুদের মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। বার বার একই কায়দায় শিশুদের প্রাণহানি ঘটলেও কোনো প্রতিকার নেই। রাজধানীতে অনেক এলাকায় এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এসব জলাশয়। এ ছাড়া অধিকাংশ জলাশয় ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সেই উন্মুক্ত জলাশয়গুলোই এখন পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া জিসানের মর্মান্তিক মৃত্যুসহ এ ধরনের ঘটনার পেছনে অভিযোগের তীর সিটি করপোরেশনের দিকে। জলাশয় থেকে ময়লা না সরানোর জন্য যে মৃত্যুগুলো হচ্ছে তাকে ‘উদাসীনতাজনিত হত্যাকান্ড’ হিসেবে দেখছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। গত শুক্রবার মোহাম্মদপুরের আদাবর খালে পড়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় ছয় বছর বয়সী জিসানের। এমন দুর্ঘটনা নতুন নয় এলাকাবাসীর কাছে। আর উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসও বলেছে, ময়লার কারণে জিসানকে পেতে পাঁচ ঘন্টা উদ্ধার অভিযান চালাতে হয় তাদের। অবহেলার কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এলাকাবাসী জানান, এর আগেও খেলতে গিয়ে ওই আবর্জনার খালে পড়েছে শিশুরা। এদের মধ্যে ছয় বছর আগে এক শিশু এ আবর্জনার স্তূপের গভীরে পচা পানিতে পড়ে মারা গিয়েছিল। এ ছাড়া বাকি যে শিশুরা এ খালে পড়েছিল, তাদের কেউ না কেউ সেখানে ঝাঁপ দিয়ে বাঁচিয়েছে। স্থানীয় ফয়েজ আহমেদ বলেন, ২-৩ সপ্তাহ আগেও এক শিশু এই আবর্জনার স্তূপে পড়ে ডুবে যেতে বসেছিল। কিন্তু সময়মতো আমি ঝাঁপ দেওয়ায় শিশুটিকে উদ্ধার করতে পারি। খালটির ময়লা ফেলতে ফেলতে এমন স্তূপ হয়েছে, এতে যে কোনো শিশু হেঁটে যেতে পারত। খেলার সময় বল ওই খালে পড়লে সাধারণত শিশুরা সেটি আনতে যেত। কিন্তু আবর্জনার স্তূপের মধ্যে কিছু কিছু জায়গায় খাদ থাকায় সেখানেই শিশুরা পড়ে যায়।

নবোদয়ের বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি এ এলাকায় গত ১৫-১৬ বছর ধরে আছি। যখন থেকে আছি, তখন থেকেই খালের এমন অবস্থা দেখছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপকক্ষ এ ব্যাপারে উদাসীন। দুই-তিন মাস পর পর খালের ময়লা সরিয়ে একপাশে রাখা হয়। কিন্তু এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় না। তিনি আরো বলেন, বছরখানেক আগে এক শিশু বল আনতে গিয়ে এ আবর্জনার পানিতে ডুবে যেতে থাকে। পরে আমি ঝাঁপ দিয়ে তাকে বাঁচিয়েছি। তবে ছয় বছর আগে এক শিশু এই পানিতে ডুবে যায়। জিসানের মতো করেই ওই শিশুটি মারা যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘জিসানের মৃত্যু এক ধরনের অবহেলাজনিত হত্যাকান্ড। জননিরাপত্তা, জনদুর্ভোগকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা আমাদের পুরো নগরীটাকে যতদিন না সাজাব, ততদিন পর্যন্ত এর পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে না।’ জলাশয়ের চিহ্ন দিয়ে বা খালের পাশে বেষ্টনীর ব্যবস্থা করে সাময়িকভাবে এমন দুর্ঘটনা সহজেই এড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা। এ ছাড়াও দীর্ঘ মেয়াদে রাজধানীর এমন ঝুঁকিপূর্ণ খালগুলো পুনরুদ্ধার করে খননের পরামর্শ পরিবেশবিদদের।

এদিকে একের পর এক দুর্ঘটনা সত্ত্বেও রাজধানীতে বেড়েই চলছে ঝিল, খাল আর জলাশয়ের ওপর ঘর বানিয়ে মানুষের বসবাস। ভালো মানের বাসার ভাড়া সামর্থ্যরে বাইরে থাকায় ঝুঁকি নিয়েই এসব বাড়িতে বাস করছেন তারা। রাজধানীর রামপুরা ঝিলপার। হঠাৎ করেই গত বছরের ১৫ এপ্রিল পানির নিচে দেবে যায় ঝিলের ওপর বানানো দোতলা একটি টিনশেড বাড়ি। প্রাণ হারায় ১২ জন। ঘটনার পর আলোচনায় আসে রাজধানীতে ঝিল, খাল বা নদী দখল করে যারা ঝুঁকিপূর্ণ বাড়ি নির্মাণ করে ভাড়া দিচ্ছেন তাদের উচ্ছেদের বিষয়টি। কিন্তু থেমে নেই ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বহীনতার কারণেই প্রতিনিয়ত ঘটছে এ রকম দুর্ঘটনা।আর সিটি করপোরেশন ও রাজউক বলছে, সমস্যা সমাধানে কম খরচে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বিকল্প বাসস্থানের কথা ভাবছেন তারা।

"