অনলাইনে ফেক নিউজের ঝড়

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

হোয়াটসঅ্যাপ ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপের প্রবল সমালোচনা হচ্ছে কারণ ভারতের সাধারণ নির্বাচনের আগে এই প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে নানা ধরনের মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে এবং অপপ্রচার চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। হোয়াটসঅ্যাপের মালিক ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা এসব বন্ধ করতে পদক্ষেপ নিচ্ছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা বলা যতটা সহজ, করা ততটা সহজ হবে না।

এ বছর মার্চ মাসের শুরুর দিকে ভারতে দেশপ্রেমের বন্যা বয়ে যায়। পাকিস্তানের ভূখন্ডের ভেতরে ঢুকে ভারতের বিমান হামলা চালানোর দাবি করে ভারতের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে নানা ধরনের ছবি শেয়ার করা হয়। ভারতে সরকার দাবি করে, ২৬ ফেব্রুয়ারির ওই হামলায় ‘বিপুল সংখ্যক জঙ্গি’ নিহত হয়। কিন্তু পাকিস্তান সরকার বলে যে, এ রকম কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। বিবিসির সত্যানুসন্ধানী দল এই নিয়ে তদন্ত করে জানতে পাওে, বিধ্বস্ত জঙ্গি আস্তানা কিংবা নিহত জঙ্গিদের যে ছবি শেয়ার করা হয়েছে সেগুলো সবই পুরোনো ছবি। ভুয়া শিরোনাম দিয়ে এগুলো চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাশ্মীরে ভূমিকম্পের দৃশ্যকে ভারতীয় বিমান হামলার দৃশ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে তিনটি মরদেহ ঘিরে একদল মুসলমান নারী-পুরুষ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। দাবি করা হয়েছে, এটা ভারতীয় হামলায় নিহত জঙ্গিদের ছবি। আসলে এই ছবি ২০১৪ সালে পাকিস্তানের আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহতদের ছবি। এটি ছাড়াও বহু ছবি শেয়ার করা হয়েছে যেখানে বিধ্বস্ত বাড়িঘর, ধ্বংসস্তূপ আর নিহত মানুষের ছবি দেখিয়ে বলা হয়েছে এসবই ভারতীয় হামলার ফল। কিন্তু ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ ছবি ২০০৫ সালের পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের ভূমিকম্পে ধ্বংসযজ্ঞের ওপর।

বিশ্বের নানা দেশে নির্বাচনকে ঘিরে যেসব ভুয়া খবর, মিথ্যা মেসেজ, বানোয়াট ছবি আর ভিডিও প্রচার করা হোয়াটসঅ্যাপ এবং ফেসবুক সেগুলো ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। সেই বিবেচনায় ভারতের আসন্ন নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে, একটা বড় পরীক্ষা হিসেবে। গত নির্বাচন অর্থাৎ ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতে ইন্টারনেট ব্যবহার বেড়ে গেছে কয়েকগুণ।

ভোটের আগে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগে ফেসবুক শত শত অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে হোয়াটসঅ্যাপ নতুন একটি পরিষেবা চালু করেছে যার মধ্য দিয়ে তথ্য যাচাই করা সম্ভব। একই সঙ্গে এই প্ল্যাটফর্মে মিথ্যা তথ্য কীভাবে ছড়ানো হচ্ছে তারা সেটিও খতিয়ে দেখবে।

সমস্যা কতখানি প্রকট?

ভুয়া তথ্য ছাড়ানোর বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে হোয়াটসঅ্যাপের পথনাট্য। ফেসবুকের জন্য ভারত একটা বিশেষ সমস্যা। এটা হোয়াটসঅ্যাপের সবচেয়ে বড় বাজারÑ প্রায় ২০ কোটি ভারতীয় এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন। বিশ্বের অন্য দেশের চেয়ে ভারতীয়রা অনেক বেশি কন্টেন্ট শেয়ার করেন।

গত বছর বিবিসির এক গবেষণায় দেখা গেছ, ভারতে ‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়া খবর ছড়ানোর পেছনে একটা প্রধান কারণ হচ্ছে জাতীয়তাবাদী ধারার পুনরুত্থান। এই জরিপে যারা অংশ নিয়েছিলেন তারা জানান, বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে পাওয়া হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের ওপর তারা বিশ্বাস রাখেন এবং কোনো বাছবিচার না করেই সেগুলো তারা অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করেন। প্রশান্ত কে রায় একজন প্রযুক্তিবিষয়ক লেখক। তিনি দিল্লিতে যে স্কুলে পড়াশোনা করেছেন সেই স্কুলের ১০০-এরও বেশি বন্ধুর সঙ্গে তিনি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে যুক্ত। হিন্দু-প্রধান হলেও এই গ্রুপে মুসলমান এবং খ্রিস্টান সদস্যও রয়েছেন।

তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে একটা মেরুকরণ লক্ষ্য করছি, গ্রুপের কিছু সদস্য অযথাই ফেক নিউজ ছড়িয়ে যাচ্ছিল। আমরা সত্যতা যাচাই করে তাদের এ ধরনের পোস্ট শেয়ার করতে বারণ করি। কিন্তু তারা কথা শোনেনি। পরে তাদের গ্রুপ সদস্যপদ স্থগিত করা হয়। এ নিয়ে একটা উত্তেজনা এখনো আছে। বহু ভারতীয় প্রথমবারের মতো ইন্টারনেটের স্বাদ গ্রহণ করেন তাদের স্মার্টফোনের মাধ্যমে। রয়টার্স ইনস্টিটিউট ভারতে ইংরেজি ভাষায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ওপর সম্প্রতি একটি জরিপ চালিয়েছে। এতে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের মধ্যে ৫২ শতাংশ জানিয়েছেন দিনের খবর তারা পান হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে। একই সংখ্যক উত্তরদাতা জানান তারা ফেসবুক থেকেও খবর পেয়ে থাকেন। গুজব ঠেকাতে হোয়াটসঅ্যাপ ভারতে মেসেজ আদান প্রদান সীমিত করে।

কিন্তু ভারতে হোয়াটসঅ্যাপে যে ধরনের কন্টেন্ট শেয়ার করা হচ্ছে তার জেরে নিরীহ মানুষের প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটেছে। বিবিসির তৈরি এক বিশ্লেষণে জানা যাচ্ছে, ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে হোয়াটসঅ্যাপ এবং অন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছাড়ানো গুজবের ফলে উত্তেজিত জনতার হাতে অন্তত ৩১ ব্যক্তি খুন হয়েছেন।

 

"