বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক আয়োজন

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আজ ১১ এপ্রিল থেকে ১৯ মের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচনের মাধ্যমেই গঠিত হবে নতুন লোকসভা। তবে নির্বাচনের ভোট গণনা হবে আগামী ২৩ মে অর্থাৎ সেদিনই জানা যাবে বিজেপি বা নরেন্দ্র মোদি আবারও ক্ষমতায় আসবেন কিনা। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপির বিরুদ্ধে মাঠে আছে কংগ্রেস ও বেশ কিছু আঞ্চলিক দল। গুরুত্বপূর্ণ উত্তর প্রদেশে বিজেপির বিরুদ্ধে জোট গড়েছে দুটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক দল। ৫৪৩ আসনের লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন হবে ২৭২ আসন। বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বড় এই নির্বাচন নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখানে তুলে ধরা হলো।

১. অবিশ্বাস্য রকম বিশাল আয়োজন : প্রায় ৯০ কোটি ভোটার এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন এবং এজন্য ভোটকেন্দ্র থাকবে ১০ লাখেরও বেশি। ভারতের ভোটার সংখ্যা যৌথভাবে ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যার বেশি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ৬৬ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিল এবং ৪৬৪টি দলের ৮ হাজার ২৫০ প্রার্থী সেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

২. দীর্ঘ সময় : এবার ভোট হবে ১১, ১৮, ২৩ ও ২৯ এপ্রিল এবং ৬, ১২ ও ১৯ মে। কিছু রাজ্যে ভোট হয় কয়েক ধাপে। ভারতের প্রথম নির্বাচন হয়েছিল ১৯৫১-৫২ সালে এবং সেটি শেষ করতে সময় লেগেছিল তিন মাস। ১৯৬২ থেকে ’৮৯ সালের মধ্যকার নির্বাচনগুলোতে সময় লেগেছিল ৪ থেকে ১০ দিন। সবচেয়ে কম চার দিন সময় লেগেছিল ১৯৮০ সালের নির্বাচনে।

৩. প্রচুর অর্থ ব্যয় হবে : ভারতীয় একটি সংস্থার হিসাবে ২০১৪ সালের নির্বাচনে দল ও প্রার্থীরা ব্যয় করেছিলেন প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার। ভারতের নির্বাচনের অংশ নেওয়া দলগুলোকে তাদের আয়ের উৎস প্রকাশ করতে হয়। গত বছর মোদি সরকার নির্বাচনী বন্ড ছাড়ে যা ব্যবসায়ী ও অন্য ব্যক্তিদের পরিচয় গোপন রেখে চাঁদা দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। দাতারা এরই মধ্যে ১৫০ মিলিয়ন ডলার এই বন্ডের মাধ্যমে দিয়েছেন এবং খবর অনুযায়ী এর সিংহ ভাগই গেছে বিজেপির কাছে। বিশ্লেষকরা বলছেন নির্বাচনটি হবে নরেন্দ্র মোদির ওপর গণভোটের মতো।

৪. নারীর হাতে সুযোগ থাকবে : ২০১৪ সালের নির্বাচনে নারী ও পুরুষের ভোটারের ব্যবধান ছিল খুব কম। নারীদের ভোট দেওয়ার হার ছিল ৬৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আর পুরুষের ছিল ৬৭ দশমিক ১ শতাংশ। দলগুলোও নারীদের গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেছে। তাদের জন্য থাকছে নানা প্রতিশ্রুতিÑ শিক্ষা লোন, ফ্রি রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার, মেয়েদের জন্য সাইকেল: এমন অনেক কিছু।

৫. নরেন্দ্র মোদি : ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বেই বিজেপি ২৮২টি আসনে জিতে নির্বাচনে বিশাল জয় পেয়েছিল। সেটিই ছিল প্রথমবারের মতো বিজেপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া। এ বিশাল জয়ের কৃতিত্ব যায় মোদির ঘরে এবং তিনি চিত্রিত হন পরিশ্রমী নেতা হিসেবে। অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা নিয়ে অসুবিধায় থাকলেও নরেন্দ্র মোদিই এখন বিজেপির প্রধান ভোট সংগ্রাহক। তার সঙ্গে রয়েছেন দলের মধ্যে তার বিশ্বস্ত একটি অংশÑ যেমন অমিত শাহ। বিরোধী পক্ষেরও তাই টার্গেট মোদি। তবে ক্ষমতায় ফেরার আশা করছে কংগ্রেস।

৬. ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন দলের আশা : ১৩৩ বছরের পুরনো কংগ্রেস কি ফিরে আসতে পারবে ক্ষমতায়? এটিই এখন বড় প্রশ্ন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে শোচনীয় হার মানতে হয়েছিল তাদের। মাত্র ৪৪টি আসন পেয়েছিলেন তারা। পরের চার বছরে অনেক রাজ্য নির্বাচনেও হেরেছেন তারা। তবে গত ডিসেম্বর থেকে দলটি শক্তি পুনরুদ্ধারের দিকে যেতে পারছে বলে মনে হচ্ছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে জয় পেয়েছে। তার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করেছেন।

৭. অর্থনীতিই মূল বিষয় : মোদি সরকারের সময়ে এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি কিছুটা গতি হারিয়েছে। শস্যের দাম পড়ে যাওয়ার ঘটনা কৃষকদের দারুণ ক্ষুব্ধ করেছে। ২০১৬ সালের নোট নিষিদ্ধের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আর সার্ভিস ট্যাক্স ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। ভাটা এসেছে রফতানি আয়েও। তাই বেড়েছে বেকারত্ব। কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ঋণের দায়ে ডুবতে বসেছে। অথচ ভারতের জিডিপি অন্তত ৭ শতাংশ হারে বাড়া প্রয়োজন। নরেন্দ্র মোদি বলেছেন অর্থনীতিতে সংস্কারের কাজ চলছে।

৮. দলগুলো লুফে নিয়েছে জনপ্রিয় ইস্যুগুলো : নরেন্দ্র মোদির সরকার সরাসরি কৃষকদের ঋণ বা ঋণ মওকুফ সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পিছিয়ে পড়াদের জন্য চাকরিতে কোটার কথাও বলছেন তিনি। রাহুল গান্ধী তার দল জিতলে গরিবদের একটি ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তা দিচ্ছেন।

৯. জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গ সমালোচকদের মতে, মোদির হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ভারতকে বিভক্ত করেছে। যদিও তার সমর্থকরা এতে বেজায় খুশি। ভারতের ১৭ কোটি মুসলিম, অনেকে মনে করেন, যে তারা অদৃশ্য সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। বিজেপির কোনো মুসলিম এমপি নেই।

১০. পাকিস্তান ইস্যু : পাকিস্তানে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা নরেন্দ্র মোদিকে একটি শক্তিশালী ইমেজ দিয়েছে। হামলা করে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে হামলা হলে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে কোনো দ্বিধা করবেন না তিনি। এটা পরিষ্কার যে, জাতীয় নিরাপত্তাকেই মোদি নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান বিষয় বানিয়েছেন। যদিও এটি কতটা কাজ করবে তা পরিষ্কার নয়।

১১. যুদ্ধক্ষেত্র : উত্তর প্রদেশ : উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তর প্রদেশ জাতীয় রাজনীতিতেও বেশ প্রভাবশালী। এখান থেকে ৮০ জন যাবেন ভারতের পার্লামেন্টে। আবার ভারতে সামাজিকভাবে সবচেয়ে বিভক্ত রাজ্যও এটি। ২০১৪ সালে বিজেপি ৭১ আসনে জিতেছিল। তবে এ রাজ্যে এবার এক হয়েছে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী মায়াবতী ও অখিলেশ যাদব। তারা ৫০টির বেশি আসন পাওয়ার আশা করছেন, যার মাধ্যমে দিল্লি জয়ের পথ বাধাগ্রস্ত হবে বিজেপির জন্য। যদিও মোদি সমর্থকরা আশা করছেন, শেষ পর্যন্ত মোদি এ জোটকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হবেন।

 

"