শূন্য হাতে অতিমানবের বিদায়!

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

ক্রীড়া ডেস্ক

চোখের জল এবং চোটাক্রান্ত হয়ে ট্র্যাককে বিদায় জানালেন সর্বকালের অন্যতম সেরা অ্যাথলেট উসাইন বোল্ট। শনিবার গভীর রাতে ট্র্যাকে নামলেও রেস শেষ করতে পারেননি ‘লাইটনিং’ বোল্ট খ্যাত এই কিংবদন্তি। এদিন আইএএএফ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের রিলে ফাইনালে সকলের চোখ ছিল বোল্টের দিকেই। ১০০ মিটার রেসে সোনা জিততে না পারায় এই রিলেকেই পাখির চোখ করেছিলেন বোল্ট।

গত সপ্তাহে ১০০ মিটার স্প্রিন্ট দিয়ে একক দৌড়ের শেষ টেনেছিলেন বোল্ট। গ্যাটলিনের কাছে সোনা হারিয়ে, ব্রোঞ্জ পদক নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। অ্যাথলেটিকস বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দিয়েই নিজের ক্যারিয়ার শেষ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। শনিবার ছিল তার ক্যারিয়ারেই শেষ দৌড়। শেষটা ভুলে যাওয়ার মতোই হলো বোল্টের। ২০০৭ সালের পর প্রথমবারের মতো ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ এই ইভেন্টের ফাইনালে হারল জ্যামাইকাও। সর্বকালের সর্বসেরা এইই স্প্রিন্টার ক্যারিয়ার শেষ করলেন মোট ১১টি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ও ৮টি অলিম্পিক সোনা নিয়ে।

এদিন মূলত চোটের কাছেই হারতে হয়েছে বোল্টকে। হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পেয়ে রিলেতেও মুখ থুবড়ে পড়তে প্রায় এক দশক ধরে ট্র্যাকে নিজের রাজত্ব চালিয়ে যাওয়া বোল্ট। ইউহান ব্লেকের হাত থেকে ব্যাটন নিয়ে শুরুটা ভালোই করেছিলেন বোল্ট। কিন্তু ফিনিশিং লাইনের কাছে হঠাৎ করেই টান ধরে তার পায়ে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে একটু পর ট্র্যাকেই লুটিয়ে পড়েন ‘অতিমানব’ এই অ্যাথলেট। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসে জামাইকার মেডিক্যাল টিম। বোল্টকে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিয়ে আসা হয় হুইল চেয়ারও। পরে অবশ্য সেই চেয়ার কাজে লাগেনি। সতীর্থদের কাঁধে চেপেই ট্র্যাক ছাড়েন বোল্ট। পরে জামাইকান মেডিক্যাল টিমের কেভিন জোন্স বলেন, ‘গত তিন সপ্তাহ খুবই কঠিন ছিল বোল্টের। আশা করি তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে উঠবে ও।’

প্রকৃতিকে হয়তো জানাতে চেয়েছে বোল্টও মানুষ। ২০০৮-এর পর এই প্রথম সেরা স্প্রিন্ট প্রতিযোগিতার আসরে সোনা জিততে ব্যর্থ হওয়া বোল্ট এ সময়ের মধ্যে নিজেকে ‘অতিমানব’ হিসেবে প্রায় প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিলেন। কিন্তু তিনিও যে মানুষ এটাই যেন প্রমাণ হলো এমন অশ্রুসজল বিদায়ে। এদিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ানশিপের রিলেতে সোনা জিতে নেয় ব্রিটেন এবং দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে রুপা জেতে আমেরিকা।

গত নয় বছর ধরে স্প্রিন্ট ট্র্যাকে একাই রাজত্ব করে গেছেন উসাইন বোল্ট। অলিম্পিক থেকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ, প্রতিটি মেজর ইভেন্টেই জিতেছেন সোনা। কিন্তু এই মহাতারকার শেষটা যে এভাবে হবে তা হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি কেউ। ক্যারিয়ারের শেষ টুর্নামেন্টে ট্র্যাজিক হিরো হয়েই ট্র্যাক ছাড়তে হলো কিংবদন্তি স্প্রিন্টার বোল্টকে।

তবে গোটা স্টেডিয়াম ক্ষণিকের জন্য যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল বোল্টের চোট দেখে। তবে খানিক বাদেই উল্লাসে ফেটে পড়েছে, জিতেছে যে নিজেদের দল! গ্রেট ব্রিটেনের উল্লাসের মাঝেই সরে গেছেন বোল্ট, শেষবারের মতো! এভাবে বিদায় তিনি নিশ্চয়ই চাননি!

এ নিয়ে সতীর্থদের কাছে বারবার দুঃখ প্রকাশও করেছেন তিনি। জুলিয়ান ফোর্তে অবশ্য সান্ত¦না দিয়েছেন বোল্টকে, ‘তিনি বারবার আমাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছিলেন। কিন্তু আমরা তাকে বলেছি যে তার কোনো দরকার নেই। ইনজুরিটা খেলারই অংশ।’ নিজের শেষ আসরে এমন অপ্রত্যাশিত ধাক্কা খেলেও বোল্টের নাম কোনো দিন মলিন হবে না বলে মন্তব্য করেছেন তার আরেক সতীর্থ ওমার ম্যাকলয়েড, ‘এই ব্যাপারটা হয়ে গেছে। কিন্তু উসাইন বোল্টের নাম মানুষ আজীবন মনে রাখবে।’

কেবল সতীর্থরাই নয়, বোল্টকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে পুরো ক্রীড়াবিশ্ব। এভাবে বোল্টের রেস শেষ হওয়ায়, মন ভেঙেছে তার কোটি কোটি সমর্থক থেকে শুরু করে ক্রীড়া দুনিয়ার অন্যান্য ব্যক্তিত্বদেরও। অনেকেই টুইট করে বোল্টকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, কেউ আবার দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, বোল্টের মতো কিংবদন্তির এভাবে কেরিয়ার শেষ হওয়াটা উচিত ছিল না। কেউ লেখেন, ‘গুডবাই বোল্ট’। আর বোল্টের চির-প্রতিদ্বন্দ্বী জাস্টিন গ্যাটলিন বলেন, ‘এর পরেও বোল্ট-ই বিশ্বের সেরা অ্যাথলেট।’ পরে নিজের টুইটার হ্যান্ডেলে বোল্টের টুইট, ‘আমার ফ্যানদের অসংখ্য ধন্যবাদ।’

এখন পর্যন্ত পৃথিবীর দ্রুততম মানব অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকে শুধু দৌড়াননি, যেন উড়েছেন এত দিন! শেষটা হলো না ঠিক শেষের মতো! কিন্তু তাতে কি! উসাইন বোল্ট তো পৃথিবীতে একজনই! সব অ্যাথলেটদের মাঝেই সেরা কি না, সেটা নিয়ে কথা থাকতে পারে। কিন্তু সেরাদের খুব সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও যে তিনি থাকবেন, সেটা তো নিশ্চিতই!

"