রোনালদোর জাদুকরী রাত

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

ক্রীড়া ডেস্ক

উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের এবারের আসরের শেষ ষোলো যেন রোমাঞ্চের সব ডালি নিয়ে বসেছে। একটার পর একটা রূপকথার গল্প লিখছে দলগুলো। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, আয়াক্সের পর পরশু রাতে অবিশ্বাস্যভাবে ফিরে এলো জুভেন্টাস। তুরিনের বুড়িদের রাজসিক এ প্রত্যাবর্তনের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। দ্বিতীয় লেগে হ্যাটট্রিক করে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন পর্তুগিজ সেনসেশন। তার আগুনঝরা পারফরম্যান্সের ওপর দাঁড়িয়ে ইতিহাস গড়ল ইতালিয়ান জায়ান্টরা; উঠল কোয়ার্টার ফাইনালে। প্রথম লেগে ২-০ গোলে হারার পর পরশু ৩-০ গোলে জিতেছে জুভেন্টাস। দুই লেগ মিলিয়ে ৩-২ গোলে জিতে শেষ আটে উঠলেন রোনালদোরা; অ্যাটলেটিকো বিদায় নিল টুর্নামেন্ট থেকে।

ফিরতি লেগে অতি মানবীয় কিছু করতে না পারলে চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে ছিটকে যাওয়ার শঙ্কা ছিল জুভেন্টাসকে ঘিরে। অতি মানবীয় কারণ, অ্যাটলেটিকোর রক্ষণ যে ইউরোপের অন্যতম সেরা। এরপর আবার এই ম্যাচের আগে চ্যাম্পিয়নস লিগে জুভেন্টাসের হয়ে রোনালদোর গোল মাত্র একটি! অথচ এই চ্যাম্পিয়নস লিগের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটির নামই রোনালদো। শেষ পর্যন্ত রোনালদো তার নামের মর্যাদা রেখেছেন। প্রমাণ করেছেন তিনি কেন সেরাদের একজন। পর্তুগিজ সেনার হ্যাটট্রিকে প্রথম লেগ হেরেও ৩-২ গোলের অগ্রগামিতায় হয়ে গেল জুভেন্টাসের ইতিহাস!

রোনালদোর ওপর অবশ্য আস্থা রেখেছিলেন একজন। কারণ তিনি এমন চিত্রনাট্য আগেই পড়েছিলেন। যেখানে নায়ক এই রোনালদোই। ২০১৫-১৬ চ্যাম্পিয়নস লিগের মৌসুমে কোয়ার্টার ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদে থাকাকালীন একই ঘটনা ঘটিয়েছিলেন রোনালদো। ওই মৌসুমে ভলফ্সবুর্গের বিপক্ষে প্রথম লেগে ২-০ গোলের ব্যবধানে হেরেও দ্বিতীয় লেগে রোনালদোর হ্যাটট্রিকে সেমিতে উঠেছিল রিয়াল। সেবার অ্যাটলেটিকোকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ। ভলফ্সবুর্গের তখনকার কোচ দিয়েতর হেকিং মঙ্গলবারের ম্যাচের আগে বলেছিলেন, ‘যদি কেউ পারে এটা, রোনালদোই পারবে। তার পক্ষে সবই সম্ভব।’

তিন বছর পর সেই রোনালদো এখন স্পেন থেকে ইতালিতে তাঁবু ফেলেছেন। আর চিত্রনাট্য ওই তিন বছর আগেরটাই। চলতি মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ ষোলোর প্রথম লেগে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের মাঠে ২-০ গোলে হেরেছে জুভেন্টাস। তুরিনের বুড়িরা যে ইতিহাস গড়তে চলেছে সেটা বোঝা গেছে ম্যাচ শুরুর দিকেই। প্রথমার্ধের পঞ্চম মিনিটেই ম্যাচে কী ঘটতে যাচ্ছে তার আভাস পায় দর্শকরা। অতিথিদের শুরু থেকেই চেপে ধরে জুভেন্টাস। আক্রমণে নেতৃত্ব দেন রোনালদো।

ষষ্ঠ মিনিটে কিয়েলিনির পা থেকে স্বাগতিকরা গোলও পায়। কিন্তু কিয়েলিনিকে বল বাড়ানোর আগে সেটা অ্যাটলেটিকোর গোলরক্ষকের হাতের ভেতর থেকে পা দিয়ে কেড়ে আনেন রোনালদো। গোলকিকের বাঁশি বাজান রেফারি। বাতিল হয় গোল। এরপর গোলের জন্য খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি দর্শকদের। ২৭ মিনিটে ফেডরিক বার্নার্ডেস্কির ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়ান রোনালদো। মিনিট চারেক পর ২৩ গজ দূর থেকে বার্নার্ডেস্কির নেওয়া ফ্রি কিক অ্যাটলেটিকোর গোলপোস্টের ওপর দিয়ে গেলে গোলবঞ্চিত হয় জুভেন্টাস। প্রথম গোলের পর প্রথমার্ধে বেশকটি ভালো সুযোগ তৈরি করেও কাজে লাগাতে পারেনি ইতালিয়ান চ্যাম্পিয়নরা।

দ্বিতীয়ার্ধে ৪৯ মিনিটে অতিথিদের বুকে ফের ছুরি চালান রোনালদো। ক্যানসেলোর হাওয়ায় ভাসানো ক্রসে মাথা ছোঁয়ান রোনালদো। সেটা ফিরিয়েও দেন অ্যাটলেটিকোর গোলরক্ষক। কিন্তু ততক্ষণে উল্লাসে মাতোয়ারা জুভেন্টাস খেলোয়াড়রা। কারণ, গোললাইন টেকনোলজিতে দেখা গেল বল লাইন পার হয়েছে ফেরানোর আগেই।

এরপর দুই দলই গোলের আপ্রাণ চেষ্টা চালায় কিন্তু অ্যাটলেটিকোর প্রায় সব শটই বেপথ। ততক্ষণে নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হতে খুব বেশে দেরি নেই। ঘড়ির কাঁটায় রেফারির সতর্ক চোখ একটু পরপর। তখনই ঘটে বিপত্তি! নিজেদের ডি-বক্সে ফাউল করে বসেন কোররেয়া। ম্যাচজুড়ে দুর্দান্ত খেলা বার্নার্ডেস্কিকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। জুভেন্টাস সমর্থকদের বুকের ধুঁকধুঁকানি থামিয়ে গ্যালারিতে উল্লাসের রং ছড়িয়ে দিয়ে সফল স্পটকিক নেন রোনালদো। তাতেই হলো তার ক্যারিয়ারের ৫২তম হ্যাটট্রিক। রোনালদোর হ্যাটট্রিক আনন্দে উড়ছে জুভেন্টাসের বহু বছরের স্বপ্নটা।

 

"