বিস্ময়ঠাসা টিম ম্যানেজম্যান্ট

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

ক্রীড়া প্রতিবেদক, আবুধাবি থেকে

শুরুতেই বাংলাদেশের টপ অর্ডার ধসে পড়াটা এশিয়া কাপের চলমান আসরের পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে। কাল আবুধাবির শেখ আবু জায়েদ স্টেডিয়ামে সুপার ফোরে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচেও একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হলো। আবারও চেনা প্রতিপক্ষ আফগানিস্তানের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ভুগতে হলো বাংলাদেশের টপ অর্ডারকে।

এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে দুইবার তীরে এসে তরি ডুবেছিল বাংলাদেশের। সেই দুঃস্মৃতির ক্ষতে প্রলেপ দিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এসেছে টাইগাররা। টুর্নামেন্টের শুরুটাও দুর্দান্ত হয়েছিল মাশরাফিদের। উদ্বোধন ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে সুপার ফোর নিশ্চিত করে ফেলে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। এরপরই খেই হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। গ্রুপ পর্বের আনুষ্ঠানিকতার ম্যাচে ভয়াবহ ব্যাটিং বিপর্যয়ের মাশুল গুনতে হয়েছে ১৩৯ রানের বড় হার দিয়ে। রশিদ-মুজিবদের আগুন বোলিংয়ে নিয়মরক্ষার ম্যাচে কোনো রকম দলীয় সংগ্রহ ১০০ ছাড়িয়েছে টাইগাররা। সুপার ফোরের প্রথম ম্যাচেও ভারতের সঙ্গে ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা ভুগিয়েছে দলকে।

কয়েক বছর ধরে ওপেনিংয়ে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন তামিম ইকবাল। কিন্তু টুর্নামেন্টের শুরুতে ইনজুরি নিয়ে তামিম যেভাবে ছিটকে গেছেন সেটা তার জন্য শুধু দুঃস্বপ্ন। তার অনুপস্থিতি ভালোভাবেই টের পাচ্ছে দল। যেখানে বরাবরই ব্যর্থ উদ্বোধনী জুটি। এশিয়া কাপে কাল পর্যন্ত খেলা চারটি ম্যাচের শুরুর জুটিতে একবারও ১৫ রানের বেশি করতে পারেনি।

এই টুর্নামেন্টে অভিষেক হওয়া নাজমুল হোসেন শান্তর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভ্যস্ত হতে যে সময় লাগবে সেটা স্পষ্ট। স্বপ্নের আসরের স্নায়ুচাপটা সামলে নিতে পারেননি তিনি। তিন ম্যাচ মিলিয়ে মাত্র ২০ রান করেছেন তিনি। আগের তিন ম্যাচে ব্যর্থ লিটন দাশ অবশ্য কাল ৪৩ বলে ৪১ রানের ইনিংস খেলে এদিন কিছুটা হলেও নিজের দায় কমিয়েছেন।

ওপেনারদের ব্যর্থতা মহাভাবনায় ফেলে দিয়েছিল বাংলাদেশ দলকে। মিডল এবং লোয়ার অর্ডার নিয়েও দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। ব্যাটসম্যানদের ধারাবাহিক ব্যর্থতা ঘুচতে আচমকা দেশ থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছে ইমরুল কায়েস ও সৌম্য সরকারকে। টুর্নামেন্টের মাঝপথে এভাবে খেলোয়াড় উড়িয়ে আনার ঘটনাটিকে ক্রিকেট বিশ্বে বিরল বলা চলে।

দুবাইতে পৌঁছানো ইমরুল-সৌম্য দলের টিম হোটেলে যোগ দিয়েছেন গভীর রাতে। দুই বাঁ-হাতির আগমন পরিবর্তনের একটা ইঙ্গিত দিয়েছিল। লিটন কিংবা শান্ত একজনের একাদশ থেকে বাদ পড়াটা প্রায় নিশ্চিত ছিল। কিন্তু সবাইকে বিস্মিয় উপহার দিয়ে আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাঁচা-মরার ম্যাচে দুজনকেই একাদশে রেখেছে টিম ম্যানেজমেন্ট। আরো বিস্ময়কর হচ্ছে বাংলাদেশের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে আবুধাবির ২২ গজে ব্যাট হাতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো লিটন-শান্ত দুজনকেই। ব্যাটিং অর্ডারে যে বড় পরিবর্তন আসছে সেটা পূর্বাভাস মিলল তাতেই। কিন্তু অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে তিন নাম্বার পজিশনেও ব্যাট করার সুযোগ পাননি ইমরুল। বাংলাদেশ দলের ছয় নাম্বার ব্যাটসম্যান হিসেবে উইকেটে দাঁড়িয়েছেন এই বাঁ-হাতি।

অথচ এক দশকের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ৭০টি ম্যাচের ৬১টিতেই ওপেনার হিসেবে খেলেছেন ইমরুল। বাকি ম্যাচগুলো তিন নাম্বার পজিশনে। কাল আফগান ম্যাচে মিডল অর্ডারে ব্যাট করার নতুন একটা অভিজ্ঞতাই হলো বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যানের। এখন প্রশ্ন হলো ইমরুলকে যদি মিডল অর্ডারেই খেলা হবে তাহলে ওপেনার নিয়ে এত হাহাকার কেন? উত্তরে থাকতে পারে কিছু খোড়া যুক্তি। তবে ইমরুলকে নিয়ে যে বাজিটা ধরেছে টিম ম্যানেজমেন্ট তা কিছুটা হলেও কাজে লেগেছে। এদিন, অবলীলায় আফগান ঘূর্ণি জাদুকর রশিদ খান এবং মুজিব উর রহমানকে মোকাবিলা করেছেন ইমরুল।

মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের পরিবর্তিত হিসেবে বাঁচা-মরার ম্যাচে এই অগ্নিপরীক্ষা দিয়েছেন ইমরুল। রুবেল হোসেনকে বসিয়ে বাড়তি একজন স্পিনার হিসেবে কাল অভিষেক করানো হলো আবার ‘নাগিন ড্যান্সে’-এর জন্য বহুল আলোচিত বোলার নাজমুল হোসেন অপুকে। ১৩টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার পর একদিনের ক্রিকেটে যাত্রা শুরু হলো তার।

ইমরুলকে ছয় নাম্বারে ব্যাটিংয়ে পাঠানোর পরও সাকিব খেললেন চার নাম্বারে। অথচ এই টুর্নামেন্টে আগের সবগুলো ম্যাচেই বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারকে দেখা যায় দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে। তিন নাম্বারে এদিন সাকিবের বদলে ব্যাট করেছেন মোহাম্মদ মিঠুন। উদ্বোধনী ম্যাচে ব্যাট হাতে দ্যুতি ছড়ানো মিঠুন অবশ্য এদিন সাজঘরে ফিরেছেন মাত্র এক রান করেই।

বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা এবং সহঅধিনায়ক সাকিব আল হাসানের বিস্ময় অবশ্য অনেক আগেই আকাশ ছুঁয়েছে। দুজনের একজনও জানতেন না ইমরুল এবং সৌম্যকে উড়িয়ে আনা হচ্ছে এশিয়া কাপ খেলার জন্য। দুজনই দুই বাঁ-হাতি আসার খবর শুনেছেন সংবাদ সম্মেলনে প্রচার মাধ্যমের কাছে। নির্বাচক, ম্যানেজার এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে যে সমন্বয়হীনতা আছে এটা এক রকম পরিস্কার। সবমিলিয়ে একাদশ নির্বাচন এবং ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের ধারাবাহিক নাটক বড্ড ধাঁধায় ফেলে দিয়েছে প্রায় সবাইকে।

"