ঘরের শত্রু বিভীষণ

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

ক্রীড়া ডেস্ক

বাল্মিকীর মহাকাব্য রামায়ণের কথা আমরা কম-বেশী সবাই জানি। যেখানে প্রধান চরিত্র রামায়ণ যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল লঙ্কাধিপতি রাবনের বিপক্ষে। ঘরের ভেতর শত্রু দেখেও রাবণের আপন ভাই বিভীষণ পক্ষ নেয় রামায়ণের। এরপরের ইতিহাসটা সবার জানা। লঙ্কা জয় করে সীতাকে উদ্ধার করে রামায়ণ। সেই থেকে বিভীষণকে দেখা হয় বিশ্বাসঘাতক রূপে। কিন্তু আজকে কি আপনি থিয়েরি অঁরিকে বিভীষণ বলবেন? ফরাসিদের কাছে হয়তো তিনি এখন বিভীষণই বটে। কারণ আজ সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামে ফ্রান্স যখন ফাইনালে উঠার জন্য লড়বে তখন প্রতিপক্ষ বেলজিয়ামের ডাগআউটে দেখা যাবে অঁরিকে। একেই বোধহয় বলে প্রফেশন। যেখানে আবেগের চেয়ে কাজের গুরুত্বটাই বেশি। ফরাসী কিংবদন্তি ফুটবলার অঁরি যে বেলজিয়ামের সহকারী কোচ। রবার্তো মার্টিনেজের সঙ্গে যিনি এঁকে চলেছেন বেলজিয়ামের সাফল্যের ক্যানভাস।

বিশ বছর পেছনে ফেরা যাক। ১৯৯৮ সালে দিদিয়ের দেশম-জিনেদিন জিদানদের সঙ্গে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের শিরোপাটা উঁচিয়ে ধরার স্মৃতিটা হয়তো এখনো আনমনে উঁকি দেয় অঁরির মনে। তখন তার বয়স মাত্র ২০ বছর। স্কোয়াডের তরুণতম সদস্য। ফাইনালের দিন সাইডবেঞ্চে বসে দেখেছিলেন জিদানদের হাতে ব্রাজিলের পরাজিত হওয়ার দৃশ্যটা। এর আট বছর পর জিদানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আরেকবার ফাইনাল খেলেন অঁরি। সেবার ফ্রান্স ফাইনালে উঠেছিল তার মাত্র গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে। তবে ইতালির বিপক্ষে ফাইনালটা সুখকর হয়নি অঁরির। পায়ে চোট পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগে মাঠ থেকে উঠে যেতে হয় তাকে। ফ্রান্স টাইব্রেকারে হেরে যায় ইতালির বিপক্ষে।

এবার ১০ বছর পর আরেকবার শিরোপার সামনে থিয়েরি অঁরি। তবে খেলোয়াড় হিসেবে নয়, কোচ হিসেবে। রাশিয়া বেলজিয়ামের সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আর মাত্র দুই ম্যাচ জিতলেই শিরোপায় চুমু খাবেন অঁরি। কিন্তু তার আগে ঘরের ছেলেদের বিপক্ষে কৌশল সাজাতে হবে তাকে। এ যেন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ এমন ত্রাহি অবস্থা অঁরির জন্য। যাদের জার্সি গায়ে একদিন বিশ্ব জয় করেছিলেন এই কিংবদিন্ত ফুটবলার আজ তাকে যুদ্ধে নামতে হবে সেই দেশের বিপক্ষে।

অঁরির এই প্রতিপক্ষ শিবিরে থাকাটা মানতে পারছেন না ফ্রান্স ফরওয়ার্ড অলিভার জিরো। সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘প্রতিপক্ষ দলের ডাগআউটে থাকবেন অঁরি। আপনি কী ভাবছেন?’ জিরোও তার কষ্টটা ঢেলে দেন রাখঢাক না রেখে। ‘আমি ব্যাপারটা মানতেই পারছি না। ওর তো আমাদের দিকে থাকা উচিৎ ছিল। আমাদেরই পরামর্শ দেওয়া উচিৎ ছিল। তবে ওর পরামর্শ যারা পাচ্ছে, তাদের জন্য আমার কোন ঈর্ষা হচ্ছে না।’

জিরোর ঈর্ষা না হলেও লাভবান হচ্ছেন কিন্তু ইডেন হ্যাজার্ড, রোমেলু লুকাকোরা। কারণটা এরই মধ্যে পেয়েও গেছেন নিশ্চয়। তার পরামর্শেই জাপানের বিপক্ষে কামব্যাকের গল্প ও ব্রাজিলকে আটকে দিয়েছিল বেলজিয়াম। লুকাকো-ডি ব্রুইনদের পরামর্শ দিয়েছিলেন কিভাবে কাউন্টার অ্যাটাকে যেতে হয়। কিভাবে প্রতিপক্ষের গোলপোস্ট ছিদ্র করতে হয়। লুকাকোর আজকে বদলে যাওয়ার পেছনে যে অঁরির হাত আছে তা তো কয়েকদিন আগে কোচ মার্টিনেজই বলেছিলেন সংবাদ সম্মলনে।

অঁরিকে ফরাসি ফুটবলে পরিচিত ‘তিতি’ নামে। অঁরি’র প্রতিপক্ষ শিবিরে থাকাটা কষ্ট দিয়েছে ফ্রান্সের তরুণ তুর্কী কিলিয়ান এমবাপ্পেকেও। এক টিভি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘থিয়েরি আমার স্বপ্নের নায়ক। উনি আমাকে উদ্দীপ্ত করেন। কিন্তু এখন তিনি আমার প্রতিপক্ষ। তার দলকে হারানোর জন্য আমি যা খুশি করব।’

বিশ্বকাপের আগে অঁরিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ফ্রান্সের বিপক্ষে বেলজিয়ারে খেলা পড়লে তিনি কি করবেন? অঁরি জানিয়েছিলেন, ‘আমরা সেতুটি পার হয়ে যাওয়া চেষ্ট করব।’ কিন্তু আজ সেই অমোঘ সত্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাকে। একদিকে প্রফেশন, অন্যদিকে দেশ। কার বিজয়ে তিনি উল্লাস প্রকাশ করবেন আর কার পরাজয়ে অশ্রুতে ভিজবেন তা সময় বলে দিবে। কিন্তু অঁরির কষ্টটা যে দ্বিগুণ হবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

"