ডাচদের ফাইনাল দুঃখ চ্যাম্পিয়ন স্পেন

প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৮, ০০:০০

গাজী মো. রাসেল

‘ওয়াকা ওয়াকা’ গানের তালে দক্ষিণ আফ্রিকা তো বটেই, নেচেছিল পুরো বিশ্ব। কলম্বিয়ান পপস্টার শাকিরার সেই গান নিয়ে উন্মাদনা কম হয়নি। এই গানটিই ছিল ২০১০ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল থিম সং। বিশ্ব মঞ্চের ১৯তম আসরটির মঞ্চ বসেছিল দক্ষিণ আফ্রিকায়। দেশটির প্রয়াত প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলাকে সম্মান জানিয়ে আফ্রিকানদের বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ দেয় ফিফা। যদিও দুই বছর আগে এই বিশ্বকাপের স্বাগতিক দল নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

তবে সেটা নিয়ে বিতর্ক হলেও সর্বোপরি সফল একটি আয়োজন উপহার দিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রথমবারের মতো আফ্রিকান দেশ হিসেবে স্বাগতিক হওয়ার সুযোগ পায় তারা। বিশ্বকাপ আয়োজনের দৌড়ে তাদের মহাদেশীয় প্রতিদ্বন্দ্বী মিসর ও মরক্কো। ভোটযুদ্ধে দুই দেশকে হারানোয় ফুটবল মহাযজ্ঞ মঞ্চায়নের গুরুদায়িত্ব পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কাঁধে। কিন্তু ২০১৫ সালের ফিফা দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন অবাক করা তথ্য ফাঁস করে দেয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে বিস্ফোরক খবর। ২০১০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে নাকি আর্থিক লেনদেন হয়েছিল ফিফা ঊর্ধ্বতন কর্তাদের। তৎকালীন ফিফা সহ-সভাপতি জ্যাক ওয়ার্নার এবং নির্বাহী কমিটির সদস্য চুক ব্ল্যাজার। শেষের জন নিজেও দুর্নীতির অভিযোগটা স্বীকার করে নেন। তবে এই বিতর্ক ও উত্তেজনা এক পাশে রাখলে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ ছাড়িয়ে গেছে অতীতের সব আয়োজনকে। নয়নাভিরাম ১০টি ভেন্যুতে ৬৪টি ম্যাচের দারুণ একটি টুর্নামেন্ট উপহার দেয় আফ্রিকার দেশটি।

স্বাগতিক হিসেবে সরাসরি বিশ্বকাপের মূলপর্বের টিকিট পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। কিন্তু বাছাইপর্বেই ঘটে গেল আরেক ঘটনা। ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে সরাসরি মূলপর্বের টিকিট পায়নি ইতালি। আজ্জুরিদের খেলতে হলো বাছাইপর্ব। আর একটু হলো তো ফিফার নতুন নিয়মের বলি হয়ে যেত ইতালির বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নটার!

ওই আসরের অংশ হওয়ার জন্য ২০৪টি দল বাছাইপর্বে অংশ নেয়। বাছাইয়ের মাধ্যমে দুই শতাধিক দল থেকে ৩১টি দল চূড়ান্ত করা হয়। প্রথমবারের মতো রাষ্ট্র হিসেবে স্লোভাকিয়া টিকিট পায় বিশ্বকাপের। এর আগে চেকোস্লোভাকিয়ার হয়েই স্লোভাকিয়ানদের বিশ্বমঞ্চে দেখা গিয়েছিল।

১৯তম বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত অংশ নেওয়া দলগুলো হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা (স্বাগতিক), ইতালি (ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন) ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, উরুগুয়ে, নিউজিল্যান্ড, প্যারাগুয়ে, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, হন্ডুরাস, আস্ট্রেলিয়া, জাপান, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, আলজেরিয়া, ক্যামেরুন, ঘানা, আইভরি কোস্ট, নাইজেরিয়া, ডেনমার্ক, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, সার্বিয়া, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, স্পেন ও সুইজারল্যান্ড।

২০১০ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা দুই দলই ছিল হট ফেভারিট। গ্রুপপর্বেও তাদের পারফরম্যান্স ছিল ফেভারিটের মতোই। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নক আউট পর্বে ওঠে এই দুই ল্যাটিন পরাশক্তি। দ্বিতীয় রাউন্ডে চিলিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেয় কাকারা। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকে কাঁদিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় সেলেকাওরা।

ল্যাটিন আরেক জায়ান্ট দল আর্জেন্টিনারও বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে সেমিফাইনালের আগে। দুরন্ত জার্মানির সামনে দাঁড়াতেই পারেননি মেসি-তেভেজরা। জার্মানদের কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে শিরোপা স্বপ্নের সমাধি হয়ে যায় আলবিসেলেস্তেদের।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার হতাশার বিশ্বকাপটা স্বপ্নপূরণের উপলক্ষ হয়ে থাকল। তারকাঠাসা স্পেন জিতে নেয় প্রথম সোনালি ট্রফি। অথচ সুইজারল্যান্ডের কাছে হার দিয়েই টুর্র্নামেন্ট শুরু করেছিল স্প্যানিশরা। কিন্তু সুইস ম্যাচটা হারের পর থেকেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেন ইনিয়েস্তা-রামোস-তোরেসরা। পর্তুগাল ও প্যারাগুয়েকে বিদায় করে শেষ চারে ওঠে স্পেন। ফাইনালে ওঠার ম্যাচে ফর্মের তুঙ্গে থাকা জার্মানিকেও হারিয়ে দেয় স্প্যানিশরা। কার্লোস পুয়োলের একমাত্র গোলে জার্মান সাঁকো পেরিয়ে যায় লা রোজারা।

জোহানেসবার্গের ফাইনালে মুখোমুখি হয় স্পেন ও নেদারল্যান্ডস। টোটাল ফুটবলের সঙ্গে স্পেনের

সোনালি প্রজন্মের লড়াইটা হলো সমানে সমান। টানটান উত্তেজনাপূর্ণ সেই ম্যাচে মোট ১৪টি হলুদকার্ড ও একটি লালকার্ড খরচ করতে হলো রেফারি হোয়ার্ড ওয়েবকে। নির্ধারিত দেড় ঘণ্টা গোলশূন্য ব্যবধানে শেষ হয়। পরে একজনে কম পরিণত হওয়া ডাচ্দের বিপক্ষে কাক্সিক্ষত গোলটি করে বসেন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। ম্যাচের বয়স তখন ১১৬ মিনিট।

এ নিয়ে তিনটি ফাইনালে হারল নেদারল্যান্ডস। এর আগেও দুইবার তীরে এস তরি ডুবেছিল ডাচ্দের। ১৯৭৪ সালে জার্মানি এবং পরের আসরে আর্জেন্টিনার হাতে স্বপ্নের সমাধি হয়ে যায় নেদারল্যান্ডসের। তিনবার ফাইনালের উঠেও শিরোপা অধরা থাকার সেই আক্ষেপটা এখনো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে কমলা শিবিরকে। ডাচ্দের ফাইনাল দুঃখ ঘোচাতে অন্তত আরো চার বছর অপেক্ষা করতে হবে। কারণ চূড়ান্ত অবনতি হওয়া নেদারল্যান্ডস যে আসন্ন বিশ্বকাপে দর্শক সারিতে থাকছে।

তবে বহু বছর পর বিশ্বকাপে চমকে দিয়েছিল উরুগুয়ে। নেদারল্যান্ডসের কাছে সেমিফাইনালে হেরে থমকে যায় তাদের তৃতীয় শিরোপা স্বপ্ন। শেষ অবধি তৃতীয় সেরা দলের স্বীকৃতি পায় দুইবারের চ্যাম্পিয়নরা। উরুগুয়েনদের এই প্রত্যাবর্তনের কা-ারি ছিলেন ডিয়েগো ফোরলান। আসরজুড়ে দ্যুতি ছড়িয়ে এই ফরওয়ার্ড জিতে নেন গোল্ডেন বল। তবে বিস্ময়কর হচ্ছে ওই আসরে চারজন সমান ৫ গোল করলেও গোল্ডেন বুটটা উঠেছে একজনের হাতেই। তিনি জার্মান তারকা থমাস মুলার। অন্যদের তুলনায় এক ম্যাচ কম খেলায় এই স্বীকৃতিটা পান বায়ার্ন মিউনিখ তারকা। ৭ ম্যাচে অবশ্য পাঁচটি করে গোল ছিল ডেভিড ভিয়া, ওয়েসলি ¯েœইডার ও ডিয়েগো ফোরলানের।

তথ্য সূত্র : ফিফাডটকম, ইডব্লিউএন, উইকিপিডিয়া

 

"