জিদানের ঢুঁসে চ্যাম্পিয়ন ইতালি

প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৮, ০০:০০

গাজী মো. রাসেল

এশিয়া ঘুরে ২০০৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল ফিরেছিল ইউরোপে। ওই আসর দেখেছে হাসি-কান্না, আলোচনা-সমালোচনা। বিশ্বকাপের আঠারোতম আসরটিকে স্মরণকালের সেরা বিশ্বকাপও বলে মনে করেন অনেকে। ইতালির বিশ্বজয়, ফরাসি কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের সেই ঢুঁস কা-, কোয়ার্টার ফাইনালে দুই ফেভারিট ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বিদায় নেওয়া, লিওনেল মেসি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর উত্থান, সর্বোপরি জমকালো আয়োজন। এসব কিছুর কারণে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে জার্মানি বিশ্বকাপ।

সফল এই বিশ্বকাপটার আয়োজন করে হিটলারের দেশ জার্মানি। আয়োজক হিসেবে আসরের আগা-গোড়া চমকে দিয়েছিল জার্মানরা। তবে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ আয়েজানের সুযোগটা সহজে পায়নি তারা। জুরিখে তিন পর্বের ভোটাভুটির মাধ্যমে হারাতে হয় ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মরক্কোকে। শেষ অবভি আঠারোতম বিশ্বকাপের স্বাগতিক হিসেবে নির্ধারণ হয় জার্মানির নাম।

স্বাগতিক দল বাদে বাকি ৩১টি টিকিটের জন্য ১৯৮টি দল বাছাই পর্বে অংশ নিয়েছিল। তাতে প্রথমবারের মতো মূলপর্বের টিকিট পায়- অ্যাঙ্গোলা, চেক প্রজাতন্ত্র, ঘানা, আইভরি কোস্ট, টোগো, ত্রিনিদাদ টোবাগো, ইউক্রেন, সার্বিয়া মন্টিনিগ্রোর। ওই আসরে অংশ নেওয়া বাকি দলগুলো হচ্ছে- জার্মানি (স্বাগতিক), ইরান, জাপান, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইকুয়েডর, প্যারাগুয়ে, কোস্টারিকা, মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, তিউনিশিয়া, আস্ট্রেলিয়া, ক্রোয়েশিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড।

এই আসরে ল্যাটিন জায়ান্ট আর্জেন্টিনা ছিল দুর্দান্ত ফর্মে। তবে সেই ফর্মে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল অবধি যেতে পেরেছিল তারা। শেষ আটে স্বাগতিক জার্মানির কাছে টাইব্রেকে হেরে বিদায় নেয় আলবিসেলেস্তেরা। ক্যাম্বিয়াসো, রদ্রিগেজদের চোখের জলে শেষ হয় আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ। তরুণ প্রতিভা মেসি অভিষেক বিশ্বকাপের স্নায়ুচাপটা সামলে নিতে পারেননি। ছিলেন নিষ্প্রভ। ল্যাটিন আরেক পরাশক্তি ব্রাজিলেরও আসরটা সুখকর হয়নি। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল গ্রুপপর্বে দুর্দান্ত সূচনা করলেও শেষ আটে ফ্রান্সের কাছে ১-০ গোলে হেরে থেমে যায় সেলেকাওদের বিশ্বকাপ মিশন।

তবে পুরো বিশ্বকাপের পাদ প্রদীপে ছিল দ্বিতীয় রাউন্ডের পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের ম্যাচটা। বিশ্বমঞ্চের ইতিহাসে এটাই ছিল সবচেয়ে বেশি ফাউলের ম্যাচ। ম্যাচটি ইতিহাসে ‘ব্যাটল অব নুর্মবগ’ নামে পরিচিত হয়ে আছে। ম্যাচ রেফারি ইভানোভ ভেলেন্টিনকে এদিন কুড়িটি কার্ড খরচ করতে হয়েছে। তন্মধ্যে ১৬টি হলুদ কার্ড এবং ৪টি লাল কার্ড। শুধু ওই ম্যাচই নয়, টুর্নামেন্ট জড়েই শারীরী ফুটবল খেলেছেন খেলোয়াড়রা। জার্মানি বিশ্বকাপে রেফারিদের ৩৪৫টি হলুদ কার্ড বের করতে হয়েছে পকেট থেকে। এছাড়া ২৮টি লাল কার্ড দেখেন খেলোয়াড়রা। বিশ্বকাপের কোনো আসরে এর চেয়ে বেশি কার্ড দেখেনি কোনো টুর্নামেন্টে।

২০০৬ সালের বিশ্বকাপ আসরে হট ফেভারিট ছিল স্বাগতিক জার্মানি। কেউ কেউ তো জার্মানদের হাতেও শিরোপা দেখেছিলেন। মিরোস্লাভ কেøাসা, শোয়াস্টেইগার, মাইকেল বালাক, লুকাস পোডলস্কিদের মতো তারকাঠাসা ছিল জার্মানির দল। কিন্তু তারকাঠাসা সেই দলটিই সেমিফাইনালে হেরে যায় আন্ডারডগ হিসেবে মিশন শুরু করা ইতালির কাছে। এর আগে ওই আসরের চমক ইউক্রেনকে থামিয়ে শেষ চারে ওঠে ইতালি। ফুটবলের আরেক পরাশক্তি ফ্রান্স সেবারও ছিল ফেভারিট। ‘বুড়ো’ জিদানের কাঁধে করে ফ্রান্সেও পৌঁছে যায় ফাইনালে। তার সঙ্গে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিলেন থিয়েরি অঁরি।

বার্লিনে ফাইনালে দুই দলই ছিল বেশ আত্মবিস¦াসী। খেলা শুরুর ২০ মিনিটের মধ্যে দুই দল গোল করে। তবে ফরাসি কিংবদন্তির জিদানের সামনে বেশ অসহায় বোধ করছিল ফ্যাবিও ক্যানাবেরোর দল। তাই ফ্রেঞ্চ লিজেন্ডকে আটকানোর ‘কুটকৌশল’ হিসেবে ফাইনালে মার্কো মাতারাজ্জিকে উসকে দেয় ইতালি। ক্ষুব্ধ জিদান মেজাজ হারিয়ে ঢুঁস মেরে বসেন মাতারাজ্জিকে। শাস্তি হিসেবে রেফারির লাল কার্ড দেখেন ফরাসি ‘জিজু’। সেটাই হয়তো ফ্রান্সের জন্য কাল হয়ে দাড়ায় শেষ পর্যন্ত। ১-১ গোলে সমতায় ম্যাচ থাকে অমীমাংসিত। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানেই ৫-৩ গোলে বাজিমাত ইতালির। চতুর্থবারের মতো স্বপ্নের বিশ্বকাপ জিতে নেয় আজ্জুরিরা।

ঘরের মাঠে বিশ্বকাপে ৫ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতে নেন জার্মান তারকা মিরোস্লাভ ক্লোসা। ফাইনালে লাল কার্ড দেখলেও জিদানের জন্য শান্তনা হয়ে এলো আসরের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি গোল্ডেন বল। স্বাগতিক জার্মানি তৃতীয় ও চতুর্থ সেরা দল হয় রোনালদো-ফিগোদের পর্তুগাল। তবে সব ছাপিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালের জিদানের সোনালি ট্রফিটার পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সেই দৃশ্যটি আজো হয়তো চোখে ভাসছে কোটি কোটি ভক্তের।

তথ্য সূত্র : বিবিসি, উইকিপিডিয়া, ফিফাডটকম

"