এশিয়ার মাটিতে রোমাঞ্চকর বিশ্বকাপ

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৮, ০০:০০

গাজী মো. রাসেল

বিশ্বকাপের মঞ্চ বসবে অথচ অঘটন ঘটবে না, আলোচনা হবে না কিংবা তুমুল বিতর্ক হবে না তা তো হয় না। বরাবরের মতো ২০০২ বিশ্বকাপও এসব কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে। এশিয়ার মাটিতে অনুষ্ঠিত হওয়া এই আসরটাকে বলা হয় বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আসর। প্রথমবারের মতো দুইটি ভিন্ন দেশ যৌথভাবে আয়োজন করে ফুটবল মহাযজ্ঞের। স্বাগতিক দল দুইটি এশিয়ার পরাশক্তি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া।

সবাইকে তাক লাগিয়ে নিজেদের উঠোনে আয়োজিত বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে যায় দক্ষিণ কোরিয়া। সেনেগাল রূপকথার সামনে শিকারে পরিণত হয়ে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স বিদায় নেয় গ্রুপ পর্বেই। সবশেষ ল্যাটিন পরাশক্তি ব্রাজিলের পঞ্চমবার শিরোপা জেতা। এসব টুকরো টুকরো ছবি দিয়েই সাজানো হয়েছিল ১৭তম বিশ্বকাপের ক্যানভাস। সেখানে তুলির ছোঁয়া দিলেন সেলেকাও কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদো। মাঠের ভেতরে এবং বাইরে দুই দিকেই আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে ছিলেন ব্রাজিলিয়ান এই লিজেন্ড।

৭২ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চ বসে ইউরোপ, আমেরিকার বাইরে। এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। মৌখিক ভোটাভুটিতে এই দুই দেশ মেক্সিকোকে হারিয়ে টুর্নামেন্টের স্বত্ব জিতে নেয়।

কিন্তু সফল বিশ্বকাপটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ইউরোপিয়ান ও আমেরিকানদের জন্য। কারণটা মহাদেশগুলোর সময়ের পার্থক্য। এশিয়ায় যখন সন্ধ্যায় খেলা শুরু হতো তখন ইউরোপের সকাল। তাই নিজেদের খেলাগুলোর সময় স্কুল কলেজ, ব্যবসায় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রেখে খেলা দেখতে হয়েছিল ওইসব দেশকে।

এশিয়ার বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে অংশ নিয়েছিল সর্বমোট ১৯৯টি দল। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স এবং দুই আয়োজক দেশ দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান সরাসরি বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা পেয়েছিল। সবাইকে চমকে দিয়ে মূল পর্বে জায়গা করে নেয় চীন, ইকুয়েডর, সেনেগাল ও সেøাভেনিয়া। চারটি দেশেরই অভিষেক হয় ওই আসরে। যদিও স্লোভেনিয়া এর আগে যুগোস্লাভিয়া নামে বেশ কয়েকবারই অংশ নিয়েছিল বিশ্বকাপে।

২০০২ বিশ্বকাপে যেসব দল অংশ নিয়েছিল তা হলো জাপান (স্বাগতিক), দক্ষিণ কোরিয়া (স্বাগতিক), ফ্রান্স (চ্যাম্পিয়ন), ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়া, ডেনর্মাক, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড, রাশিয়া, সেøাভেনিয়া, স্পেন, সুইডেন, তুরস্ক, ইকুয়েডর, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে, কোস্টারিকা, মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, ক্যামেরুন, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, তিউনেশিয়া, চীন ও সৌদি আরব।

আসরের শুরুটাই হয়েছিল বড় একটা অঘটন দিয়ে। জিনেজিন জিদানবিহীন ফ্রান্সকে হারিয়ে দেয় সেনেগাল। ১-০ গোলের সেই হারটাই ফরাসিদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। বাড়ি ফিরতে হয় প্রথম রাউন্ডেই। এরপর সুইডেনকে হারিয়ে শেষ আটে উঠে গিয়েছিল আফ্রিকান দলটি। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে তুরস্কের কাছে থেমে যায় তাদের স্বপ্নযাত্রা। আরেক চমক তুরস্ক আবার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে হেরে যায় ব্রাজিলের কাছে।

শুধু ফ্রান্স নয়, দুইবারের বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনাও বিদায় নিয়েছিল গ্রুপ পর্ব থেকেই। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, হুয়ান ভেরন, পাবলো সোরিন ও হার্নান ক্রেসপোর মতো তারকাঠাসা দল নিয়েও প্রথমবারের মতো প্রথম রাউন্ড থেকে ছিটকে যাওয়ার লজ্জায় পড়তে হয় আর্জেন্টিনাকে। এছাড়া ছিয়াশির পর বিশ্বকাপে ফিরেও উপলক্ষটা রাঙাতে পারেনি পর্তুগাল। পর্তুগিজরা উঠতে পারেনি নকআউট পর্বে।

ঘরের মাঠে বিশ্বকাপে খেলা জাপান ওই আসরেই প্রথমবারে মতো টিকিট পায় নকআউট পর্বের। তবে আরেক স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা চমকে দিয়েছিল। পর্তুগাল, পোল্যান্ডকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠে তারা। নকআউট পর্বের শুরুতে ইতালি প্রাচীর টপকে যায় কোরিয়ানরা। নির্ধারিত দেড় ঘণ্টা শেষে আজ্জুরিদের ১-১ গোলে রুখে দেয় স্বাগতিকরা। পরে ‘গোল্ডেন গোলে’র ওপর দাঁড়িয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় তারা।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম গোল্ডেন গোলের লড়াইটা ওই ম্যাচেই দেখেছিলেন ফুটবলপ্রেমীরা। শেষ আটের ম্যাচেও গোল্ডেন টাইম খেলতে হয় কোরিয়ানদের। কিন্তু স্পেনের সঙ্গে অমীমাংসিতভাবে শেষ হয় অতিরিক্ত সময়ের খেলা। পেনাল্টি শুটআউটে স্নায়ুচাপের চূড়ান্ত পরীক্ষা দেয় কোরিয়া। নাটকীয় টাইব্রেকারে জিতে সেমিফাইনালে উঠে যায় স্বাগতিকরা।

কোরিয়ার স্বপ্নযাত্রা থেমে যায় তুমুল ফর্মে থাকা শিরোপা প্রত্যাশী জার্মানির কাছে। সৌদি আরবকে ৮-০ গোলে চূর্ণ করা জার্মানদের অবশ্য বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয় কোরিয়ানদের বিদায় করতে। ১-০ গোলের কষ্টের জয়ে ফাইনালে ওঠে মাইকেল বালাক, মিরোস্লাভ, ক্লোসা ও অলিভার কানদের জার্মানি। কিন্তু ম্যাচটা জিতলেও লালকার্ড কেড়ে নেয় জার্মানির প্রধান ভরসা বালাককে।

শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে অনুমিতভাবেই তারকাঠাসা ব্রাজিলের সামনে দাঁড়াতে পারেনি জার্মানি। জার্মানরা ৩-০ গোলে হারিয়ে সর্বোচ্চ পঞ্চমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় ল্যাটিন পরাশক্তি ব্রাজিল। কাফু, রোনালদো, কার্লোস, রোনালদিনহো, রিভালদো ও গিলবার্তোদের গড়া কিংবদন্তিরা প্রমাণ করেছিলেন ওই আসরে ব্রাজিল কেন হট ফেভারিট ছিল। তবে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে আসরটা ছিল শুধুই রোনালদোর। ‘ফেনমেনম’ খ্যাত এই ব্রাজিলিয়ান সর্বোচ্চ ৮ গোল করে জিতেছেন গোল্ডেন বুট।

জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালের দুইটি গোলই করেছেন রোনালদো। ফাইনালের আগে মাত্র এক গোল হজম করা জার্মান গোলরক্ষক অলিভার কান শেষ পর্যন্ত ক্রসবার আগলে রাখতে পারেননি। রোনালদো গুঁড়িয়ে দেন বাধার প্রাচীর। তবে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচের আগে আসরজুড়ে দ্যুতি ছড়ানোর পুরস্কার হিসেবে গোল্ডেন বল এবং গ্লাভস দুইটিই জিতেছেন জার্মান কিংবদন্তি গোলরক্ষক অলিভার কান।

তথ্য সূত্র : ফিফাডটকম, বিবিসি, উইকিপিডিয়া

"