মায়ার চাদর

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২০, ০০:০০ | আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২০, ০৩:২৭

শাম্মী তুলতুল

খট করে আওয়াজ হতেই সখিনা বেগমের ঘুম ভাঙে। লাইটের আলোতে আবছা একটি কালো ছায়া দেখতে পান তিনি। দেখেই ভয় পান, ভাবেন চোর ঢুকেছে ঘরে। বিছানা ছেড়ে একটু এগোতেই দেখেনÑ সত্যি সত্যি এক চোর রান্নাঘরে উঁকিঝুঁঁকি দিচ্ছে। তিনি ভয় পেয়ে গেলেন।

সখিনা ভাবলেন, একবার চিৎকার করে উঠবেন। কিন্তু ওটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না ভেবে শোবার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। কটরমটর আওয়াজ হচ্ছিল রান্নাঘর থেকে। এদিকে স্বামী বেচারা সারা দিন খেটে ঘুমাচ্ছেন। তাকে ডাকতেও মন সায় দিচ্ছে না। তখন তিনি চালাকি করলেন। সাহস করে পানি খেতে টেবিলে গেলেন। ইচ্ছা করেই গ্লাস নড়াচড়া করছিলেন। যেন চোর বুঝতে পারে ঘরের মানুষ জেগে আছে। তিনি এবার নিজে নিজে কথা বলছিলেন। হ্যাঁ গো শুনছো শাওনের আব্বা, আজ না শাওনের পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে বলল সে।

তিনি আবার উত্তর নিচ্ছিলেন এমন ভাব। হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই তাই।

তার শিক্ষক খুব প্রশংসা করলেন। আমারও ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল। নিজ ছেলে বলে কথা। বুঝলে, মনটা আজ খুব ভালো।

সখিনা আবার স্বামীকে হাঁক দিলÑ আরে শুনোই না। এবার চোর একটু ভড়কে গেল। সে নড়াচড়া বন্ধ করে দিল। সখিনা ভাবেন, এই চোর হাঁড়ি-পাতিল চোর নয়তো? রান্নাঘর থেকে সরেই না। তবে এই চোর খাবার চোর, সেটা বোঝার উপায় এ মুহূর্তে সখিনার নেই।

রান্নাঘরে খুব সুন্দর করে গোছানো হাঁড়ি-পাতিল। চোর তা দেখেই খুব খুশি। আহা কত মজার মজার খাবার আছে হাঁড়ির ভেতরে। তার মনে লাড্ডু ফুটে। কিন্তু গৃহস্থের ভয়ও মনে মনে। একটু পর এদিক-ওদিক তাকিয়ে হাঁড়ির ঢাকনা তুলে হাত ঢুকিয়ে দেখে প্রথম হাঁড়িতে কিচ্ছু নেই।

ওমা, সেকি কিছুই তো নেই। আবার অন্য হাঁড়িতে হাত ঢুকিয়ে দেখে তাও খালি। এবার চোর মশাইয়ের ভ্রু কুঁচকানো দেখে কে? মুখ হয়ে গেল বেজায় কাল। এ মুহূর্তে বের হওয়ার পথও নেই, গৃহস্থ যে বসে আছে ওদিকে। সে তখন বুদ্ধি বের করল, সখিনা বেগম ঘুমিয়ে গেলে মাথায় হাঁড়ি চড়িয়ে মাথা নিচু করে দেবে ভোঁ দৌড়।

চোর সখিনার গতিবিধি লক্ষ করছিল। খানিক বাদে দেখে তিনি ঝিমুচ্ছেন। তা দেখে মনে মনে খুশি হয়ে দিল দৌড়। কিন্তু হুমড়ি খেয়ে পড়ল মাটিতে। সখিনা জেগে যান শব্দে। বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে দেখেন ১০ কি ১২ বছরের এক ছেলে মাটিতে পড়ে আছে। বাচ্চা ছেলে দেখে সখিনার ভয় একটু কমল।

সামনে এগিয়ে বলেন, আমার ঘরে চুরি করতে এসেছিস? সাহস তো কম না তোর।

চোর ভয়ে কাঁদো কাঁদো, না না আমি চুরি করতে আসিনি।

তাহলে কেন এসেছিস?

চোর ঢোক গিলতে গিলতে বলে, আমি খাবার খেতে এসেছি।

আমার পেটে খুব খিদে। খাবার নেই, তাই পালিয়ে যাচ্ছিলাম, এখন আছাড় খেয়ে পায়ে ব্যথা পেলাম খুব। আমাকে মাফ করে দিন, আমি আর খাবার চুরি করব না। আর কখনো এখানে আসব না। আমাকে মাফ করে দিন।

খাবার চাইলে তো খুঁজে খেতে পারিস। চুরি করার কী আছে?

আমাদের কেউ খাবার খুঁজলে দেয় না।

অথচ কত খাবার ফেলে দেয়। আমরা চাইলেই দোষ। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে। ছেলেটির কথা শুনে সখিনার খুব মায়া হলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেটিকে হাত দিয়ে টেনে তুলছিলেন, তখন সে একটু ঘাবড়ে গেল। তাকে ভয় পেতে দেখে সখিনা বলেন, ভয় পাসনে মারব না, উঠে যা। সোফায় বস।

ছেলেটি তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে সোফায় জড়সড় হয়ে বসে। সখিনা ফ্রিজ খুলে যা যা আছে খেতে দিলেন। অনেক রকম মিষ্টান্ন, পেটিস, কেক ও হরেক রকম পিঠা। তার বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, তার কোনো বাড়ি নেই। কেউ নেই। বন্যায় সব ভেসে গেছে। মসজিদ-মাজারে পড়ে থাকে। পেলে খায়, না পেলে উপোস থাকে।

সখিনা তখন একটা প্রস্তাব রাখেন ছেলেটির কাছে, তোকে কোনো কাজ দিলে করতে পারবি?

পারব। কিন্তু কী কাজ?

আজ থেকে আমার বাগানে শুধু দুই বেলা পানি দিবি আর আমার ঘরেই থাকবি।

সহজ কাজ, আমি খুব পারব।

আমি তোকে ভাত, পানি, নাশতা সব খাওয়াব। তোর আর খাবারের চিন্তা করতে হবে না।

ছেলেটি তখন খুশিতে কেঁদে দিল আর অবাক করে দিয়ে বলল, আমি কি আপনাকে খালাম্মা ডাকতে পারি?

সখিনা তার কথা শুনে এক গাল হেসে দিলেন।

ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে বললেন, আজ থেকে আমি তোর সব। আমি তোকে মায়ার চাদরে ঘিরে রাখব।

 

"