স্কুলের টিফিন

প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০২০, ০০:০০

ফারুক হোসেন সজীব

শিপন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ভীষণ গরিব ওরা। বাবা অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে সংসার চালান। আর মা নিজের বাড়িতে এবং অন্যের বাসায় ঝিয়ের কাজ করেন। শিপনের আরো দুই বোন আছে। ওদের এখনো স্কুলে যাবার সময় হয়নি। তবে কয়েক মাসের মধ্যে ওদের স্কুলে দিতে হবে। শিপনের বাবা-মায়ের খুব ইচ্ছা তাদের সন্তানদের লেখাপড়া করাবেন। কিন্তু লেখাপড়া করতে তো টাকার দরকার। তাই মাঝে মাঝে আশপাশের মানুষগুলো শিপনের বাবাকে বোঝায়, ছেলেকে স্কুলে পড়িয়ে কাজ নেই! তার চেয়ে খামারের কাজে লাগিয়ে দাও! দু পয়সা উপার্জন করুক। কিন্তু শিপনের বাবা বুঝতে পারেন তিনি যে ভুল করেছেন পড়াশোনা না করে, সেই একই ভুল তিনি সন্তানকে কিছুতেই করতে দেবেন না। শিপনের বাবা কৌশলে তাদের কথাগুলো এড়িয়ে গিয়ে বলেন, দেখা যাক! কী করা যায়।

শিপন জানে বাবা সারা দিন অনেক কষ্ট করে রোজগার করেন। সংসারের খচর চালাতেই বাবাকে হিমশিম খেতে হয়। এজন্য শিপন বাড়তি কোনো টাকাও বাবার কাছে চাইতে পারে না। কিন্তু স্কুল ছুটি হয় সেই চারটা নাগাদ। এত সময় ধরে শিপন স্কুলে কিছুই খেতে পায় না। কিন্তু ক্লাসের সবাই বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসে। কেউ পরোটা, কেউ রুটি, ডিম ভাজি। কেউ কেউ তো আবার বার্গারও খায়! কিন্তু শিপন টিফিন ক্যারিয়ারে কিছুই নিয়ে আসে না। মাঝে সে নিজেদের গাছের দু-একটা পিয়ারা নিয়ে আসে। আসলে টিফিন ক্যারিয়ারটা শিপন স্কুলে নিয়ে আসে অন্য বন্ধুদের দেখানোর জন্য। কারণ শিপন স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বুঝতে পেরেছে, এখানে সবার মতো তাকেও চলতে হবে। অনেকটা দেখানোর জন্য হলেও। না হলে স্কুলে সবাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। শিপন বাবা-মায়ের কষ্টের টাকায় পড়াশোনা করছে। সে কারো কাছে হাসির পাত্র হতে চায় না।

স্কুলে টিফিনের সময় হলেই শিপন একটু দূরে আড়ালে চলে যায়। টিফিন হাতে। বন্ধুরা ভাবে, শিপন টিফিন করতে একটু আড়ালে যাচ্ছে। তার মানে খেতে যাচ্ছে। কিন্তু বন্ধুরা কেউ ঘুণাক্ষরেও জানে না যে, শিপনের টিফিন ক্যারিয়ারে কিছুই নেই। সে টিফিন ক্যারিয়ারটা নিয়ে দূরে একটা টিউবওয়েলের জল খেতে যায়। এভাবে বেশ চলছিল শিপনের স্কুলের দিনকাল। এক দিন শিপন স্কুলটাইমে বাইরে গিয়েছিল একটি কাজে। আর সেই সুযোগেই শিপনের কিছু বন্ধুরা শিপনের ব্যাগটি খুলে ফেলে। কারণ শিপন খুব ভালো ছাত্র। সবাই তাই শিপনের খাতা দেখতে চায়। আর শিপনের হাতের লেখাও দারুণ। বাংলা শিক্ষক তো প্রতি ক্লাসেই শিপনের প্রশংসা করেন। তাই অন্য বন্ধুরা একটু বেশিই হিংসে করে। বন্ধুরা যেই না দেখল শিপন ক্লাসে নেই, অমনি ওরা ব্যাগের মধ্যে যা ছিল সব খুলে দেখতে লাগল। হঠাৎ ওরা একটি প্লাস্টিকের টিফিন ক্যারিয়ার দেখতে পেল। ওদের ভীষণ কৌতূহল হলো না জানি কী মজার খাবার আছে টিফিন বাক্সে। কিন্তু কী আশ্চর্য! টিফিন বাক্সে কোনো খাবার নেই! তাহলে?

বন্ধুরা এমন আশ্চর্য ঘটনা দেখে অবাক হলো। খুব তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে যা বের করেছিল সব আবার আগের মতোই ব্যাগের ভেতরে রেখে দিল। কিছুক্ষণ পর শিপন রুমে এসে চুপচাপ ক্লাসে বসল। আরেকটি ক্লাস শেষেই টিফিন। শিপন প্রতিদিনের মতো টিফিন বাক্সটি নিয়ে দূরে আবার সেই টিউবওয়েলের দিকে গেল। অন্য বন্ধুরা সবাই এই দৃশ্যটি দেখে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। সবাই অবাক হয়ে দেখল। শিপন টিউবওয়েলের খালি জল খেয়ে আবার তাদের কাছে ফিরে আসছে। এই দৃশ্য দেখে বন্ধুরা ভীষণ কষ্ট পেল। মনে মনে নিজেদের ধিক্কার দিল। একে অপরকে বলতে লাগল, আমরা এত দিন এত এত টিফিন এনে খেতে না পেরে শেষে নষ্ট করেছি। ফেলেও দিয়েছি! অথচ আমাদের ক্লাসের একজন ভালো বন্ধুটির কোনো খোঁজখবর নিইনি। শিপনরা ভীষণ গরিব তা সবাই জানত। তাই বলে শিপনের টিফিন খাওয়া টাকাও নেই! শিপন প্রতিদিন টিফিনে না খেয়ে থাকে? আর খালি টিফিন বাক্সটি শুধু আমাদের দেখানোর জন্য নিয়ে আসে? সব বিষয় বন্ধুদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। বন্ধুরা ভীষণ লজ্জিত হলো। সবাই প্রতিজ্ঞা করল। শিপনের টিফিনের ব্যবস্থা তারাই করবে। এজন্য সবাই যেন একটু বেশি করে টিফিন নিয়ে আসবে স্কুলে। সবাই রাজি হলো।

এক বন্ধু বলল, কিন্তু শিপনকে কীভাবে টিফিন খাওয়াব ও যদি খেতে না চায়?

অন্য বন্ধু বলল, প্রথমে আমরা চুপিচুপি ওর টিফিন বাক্সে আমাদের আনা খাবারগুলো রেখে দেব। যেন ও বুঝতে পারে আমরা বিষয়টি জেনেছি। পরে আমরা সবাই মিলে ওকে খেতে রাজি করাব। আর শিপনকে বলব, আমরা ওর প্রকৃত বন্ধু। শিপন আমাদের খুব ভালোবাসে। আমাদের অনুরোধ ফেলতেই পারবে না।

সবাই সম্মত হলো। হাতে হাত মিলিয়ে বলল, ওকে ডান। তাই হবে!

পরদিন টিফিন টাইমে শিপন যেই না ওরা ব্যাগটি খুলে টিফিন বাক্সটি হাতে নিল। ভীষণ অবাক হলো। কারণ টিফিন বাক্সটি বেশ ভারী হয়ে আছে। কিন্তু টিফিন বাক্সটি এত ভারী কারণটা কী? শিপন তাড়াহুড়ো করে বাক্সটি খুলল। আর দেখতে পেল বাক্সটির ভেতরে পরোটা, রুটি, ডিম ভাজিতে ভরপুর। শিপন অবাক হয়ে আশপাশে বন্ধুদের দিকে তাকাল। দেখল, বন্ধুরা সবাই যে যার মতো খেতে ব্যস্ত। শিপন কী করবে ভেবে না পেয়ে এদিক-ওদিকে তাকাতে লাগল। বন্ধুরা যখন দেখল, শিপন কিছু খাচ্ছে না! তখন সবাই এসে শিপনকে বলল, জলদি খেয়ে নাও বন্ধু! ওগুলো তোমার টিফিন। আমরাই তোমার জন্য রেখেছি। আমরা প্রতিদিন টিফিন খাব আর আমাদের বন্ধুটি টিফিন না খেয়ে কষ্ট পাবে। তা আমরা কিছুতেই হতে দেব না। শিপন ভীষণ অবাক হয়ে আমতা আমতা করতে লাগল। বন্ধুরা বলল, তুমি না খেলে আমরাও আর আমাদের টিফিন খাব না। বন্ধুদের এমন আচরণের জন্য শিপন ভীষণ আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ল। তারপর বন্ধুরা শিপনকে একটু একটু করে রুটি, পরোটা মুখে তুলে খাওয়াতে লাগল। সেই সঙ্গে ওরা নিজেরাও একে অপরকে খাইয়ে দিল। সেই দিনের পর থেকে টিফিন টাইমের পুরো দৃশ্যটিই পাল্টে গেল। এখন ওরা সবাই একটি বড় পেপারে কিংবা গামলায় সবার খাবার রেখে, ভাগাভাগি করে খায়। সেদিনের পর থেকে শিপনের মতো আর কেউই টিফিন খেতে না পেরে ক্ষুধায় কষ্ট পায়নি!

 

"