বন্ধু

প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২০, ০০:০০

আবদুস সালাম

দিপুর মা-বাবা দুজনেই চাকরি করেন। খুব সকালে চাকরির উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে যান। ফিরতে ফিরতে প্রায়ই সন্ধ্যা হয়। সে সময় দিপুর দেখাশোনা করার দায়িত্ব পড়ে গৃহকর্মী মাজেদার ওপর। মাজেদা খুব বিশ্বস্ত গৃহকর্মী। সে দিপুর বাবা মঈন সাহেবের গ্রামের মেয়ে। নিজের সন্তানের মতো মাজেদা দিপুকে মানুষ করে। তাকে নিয়ে সে স্কুলে নিয়মিত যাতায়াত করে। সময়মতো রান্নাবান্না করে দিপুকে খাইয়ে দেয়। ঢাকা শহরে তার মতো একজন গৃহকর্মী পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। সে বাসায় থাকলে ছেলেকে নিয়ে মা-বাবাকে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হয় না। অবশ্য দিপুর মা-বাবাও মাজেদাকে খুব ভালোবাসেন। যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দেন। প্রয়োজনে টাকা-পয়সা খরচ করতে কার্পণ্য করেন না। গ্রামে মাজেদার একটি ছেলে রয়েছে। ওর নাম রতন। সে দিপুর চেয়ে বয়সে ছোট। রতন গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করে।

রতনের পড়ালেখার খচর দিপুর মা-বাবাই বহন করে। দু-চার দিন অফিস ছুটি থাকলে অথবা গ্রাম থেকে কোনো নিকট আত্মীয় বেড়াতে এলে দিপুর মা-বাবা মাজেদাকে ছুটি দিয়ে দেন। মাজেদা গ্রাম থেকে ঘুরে আসে। কদিন আগে দিপুর বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। দাদা-দাদি গ্রাম থেকে দিপুদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। কদিনের জন্য মঈন সাহেব মাজেদাকে ছুটিতে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়। ছুটি দেওয়ার সময় মাজেদাকে বলে, ‘রতনের স্কুল এখন ছুটি রয়েছে। যদি ঢাকা আসতে চায়, তাহলে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসো। কদিন বেড়িয়ে যাবে। দেখবে ওর ভালো লাগবে।’ সত্যি সত্যি মাজেদা তার ছেলে রতনকে নিয়ে দিপুদের বাড়িতে নিয়ে আসে। এতে দিপু খুশি হতে পারে না। সে রতনের সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলে না। খেলা করে না। এক দিন দিপুর মা অফিসে যাওয়ার সময় দিপুকে বলে, ‘তোমার তো অনেক খেলনা আছে। রতনকে কয়েকটা খেলনা বের করে দাও। দুজনে একসঙ্গে খেলা করো।’ দিপু মায়ের কথা শোনে না। সে একটি খেলনাও বের করেনি এবং ওর সঙ্গে ঠিকমতো কথাও বলেনি। দিপুর দাদা-দাদিও বুঝিয়েছে। তাতেও কাজ হয়নি। গৃহকর্মীর ছেলে বলে দিপু রতনের সঙ্গে মিশতে চায় না। এতে অবশ্য মাজেদার কোনো রাগ হয় না। সে জানে, ছোটরা এ রকম একটু-আধটু করবেই। বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। তার বিশ্বাস, দিপু এক দিন বাবার আদর্শ বুকে ধারণ করে বড় হবে। ওদিকে বদ্ধ ঘরের মধ্যে রতনের এক দিন ভালো লাগে না।

তার দম বন্ধ হয়ে আসে। সে গ্রামে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করতে থাকে। তাই দুদিন পরেই মাজেদা রতনকে গ্রামে রেখে আসে। এক দিন দিপুর দাদা তাকে মজার মজার গল্প শোনায়। দাদা বলেন, আমাদের মহানবী শিশুদের খুব ভালো বাসতেন। শিশুদের আদর-স্নেহ করতেন। মহানবী (সা.) শুধু শিশুদের ভালোবাসেননি। বরং তাদের খোঁজখবরও নিতেন। মাঝেমধ্যে তাদের সঙ্গে আনন্দ-রসিকতা করতেন। ঘোড়া সেজে অনেক সময় নাতি হাসান ও হোসাইনকে পিঠে নিয়ে মজা করতেন। বিশ্বনবী হয়েও তিনি শত ব্যস্ততার মাঝে শিশুদের খোঁজখবর নিতেন। মক্কা বিজয়ের পর যখন মহানবী (সা.) মক্কা শহরে আগমন করেন, তখন ছোট ছোট বাচ্চা তার কাছে আসত। তিনি তাদের আদর-সোহাগ করতেন। কখনো তাড়িয়ে দেননি। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে শিশুদের প্রতি স্নেহ ও আদর দেখায় না, এমন ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার করা উচিত।’

মহানবী (সা.) আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শিশুকে স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান দেখায় না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ তাই আমরা ছোটদের সঙ্গে সব সময় ভালো ব্যবহার করব। তাদের দেখে হিংসা করব না। দাদা দিপুকে একটা কথা মনে করিয়ে দেন। যারা বাড়িতে বেড়াতে আসে তাদের বলা হয় মেহমান। মেহমানদের সঙ্গে সব সময় ভালো ব্যবহার করতে হয়। মেহমানদারি নবীদের আদর্শ। মেহমানদারি মানুষে-মানুষে বন্ধন দৃঢ় করে। সম্পর্কের গুরুত্ব বাড়ায়। পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ সৃষ্টি করে। মেহমানদারিতে আছে আনন্দ ও পুণ্য। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মেহমানদারির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অনেক সময় অতিথি আপ্যায়ন করতে গিয়ে তাকে ও তার পরিবারকে অনাহারে থাকতে হতো। নিজ ঘরে মেহমানদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে না পারলে তিনি মেহমানদের কোনো ধনী সাহাবির বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। দাদার কাছে গল্প শুনে দিপুর মনটা খারাপ হয়। সে মনে মনে ভাবে,

রতনের সঙ্গে আমার ভালো ব্যবহার করা উচিত ছিল। ওকে দেখে আমার হিংসা করা ঠিক হয়নি। দেখতে দেখতে কয়েক বছর কেটে যায়। এরমধ্যে রতন আর ঢাকাতে আসেনি। এক দিন দিপু গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যায়। খবর পেয়ে রতন ছুটে আসে। রতন দিপুকে গ্রামটা ঘুরে ঘুরে দেখায়। গ্রামের অবারিত সবুজ প্রান্তর দেখে দিপুর প্রাণটা জুড়িয়ে যায়।

চারপাশের খোলামেলা প্রকৃতি, পাখপাখালির মধুর সুর দিপুকে মুগ্ধ করে। দিপু লক্ষ করেছে, গ্রামের মানুষগুলো খুব সহজ-সরল। তারা একে অপরের খোঁজখবর নেয়। ভালোমন্দ জিজ্ঞাসা করে। অল্প কদিনেই রতন দিপুকে আপন করে নেয়। ঢাকায় ফিরে যাওয়ার সময় তার দুচোখ জলে ভরে যায়। রতনের জন্য দিপুর মনটা পুড়তে থাকে। বছরখানিক পর রতন মায়ের সঙ্গে আবার দিপুদের বাড়িতে আসে। এবার দিপু রতনকে দেখে খুশি হয়। তার মতো একজন খেলার সঙ্গী পেলে কে না খুশি হবে? দুজনার খুব ভালো সময় কাটে। তারা একে অপরের কাছ থেকে গ্রাম-শহরের গল্প শোনে। এক দিন দিপুর বাবা দুজনকে নিয়ে চিড়িয়াখানা ও জাদুঘরে বেড়াতে নিয়ে যায়। দুজনে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। দিপুর মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ করে মাজেদাও খুশি হয়। সে আগের চেয়ে দিপুকে আরো বেশি ভালোবাসে। কাজকর্মে অধিক মনোযোগী হয়। রতন যেদিন গ্রামে ফিরে যায়, তখন দিপু তাকে কলম ও খাতা উপহার দেয়। সে বাবাকে রতনের জন্য নতুন একটা জামা কিনে দিতে বলে। বাবা ছেলের অনুরোধ ফেলতে পারেনি। নতুন একটা জামা কিনে দেয়। রতন সেই উপহার আনন্দের সহিত গ্রহণ করে। রতন ও তার মা দুজনাই দিপুদের প্রতি কৃতজ্ঞ। রতন গ্রামে চলে যাওয়ার সময় দিপুকে বলে, ‘এবার নববর্ষের ছুটিতে আমাদের গ্রামে আসবে। গ্রামে বৈশাখী মেলা বসে। সুন্দর সুন্দর জিনিস বিক্রি হয়। নদীতে নৌকাবাইচ হয়। পুতুল নাচ হয়। তোমাকে সব ঘুরে ঘুরে দেখাব। দেখবে তোমার ভালো লাগবে।’ রতন গ্রামে থাকলে দিপু তার খোঁজখবর নেয়। সব সময় তাকে অনুভব করে। রতনেরও মনটা আনচান করে দিপুর জন্য। এভাবেই তারা একে অপরের বন্ধুতে পরিণত হয়।

 

"