আবিরের গ্রামের বাড়ি

প্রকাশ | ১৮ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০

সাইদুল তাসফিন

আবির ক্লাস সিক্সে পড়ে। ঢাকার একটা কিন্ডারগার্টেন থেকে সে গত বছর পিইসিই পরীক্ষায় এ+ পেয়েছে। অনেক মেধাবী ছাত্র। তার বাবা একটা সরকারি চাকরি করে। তার জন্ম ঢাকায়। পরিবারের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় থাকে সে। তার গ্রামের বাড়ি সম্পর্কে সে তেমন কিছু জানে না। কারণ তার বুদ্ধি হওয়ার পর সে মাত্র একবার গ্রামে গেছে। সেটাও চার বছর আগে। তাই তার গ্রাম সম্পর্কে তেমন কিছুই মনে নেই তার। সেবার তিন-চার দিন থেকেই গ্রাম থেকে চলে এসেছিল তারা। তাই গ্রাম সম্পর্কে তার তেমন ধারণা নেই বললেই চলে।

ঢাকা শহরের চার দেয়ালের সঙ্গেই তার শুধু পরিচিতি। তার কাছে বাংলাদেশ মানে বড় বড় দালান, গাড়িবহর, জ্যাম এবং মানুষের কোলাহল। সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশ সম্পর্কে সে শুধু বইতেই পড়েছে, বুদ্ধি হওয়ার পর বাস্তবে দেখনি তার স্বদেশ কেমন! কত অপরূপ তার মাতৃভূমি!

বাবার কাছ থেকে খবরটা শুনেই খুশিতে লাফিয়ে উঠেছিল আবির। আগামী সপ্তাহে তারা গ্রামে বেড়াতে যাচ্ছে। বাবার অফিস বন্ধ। আবিরের স্কুলও আগামী সপ্তাহ থেকে বন্ধ। শীতের ছুটি। সে ভেবেছিল এবারের শীতের ছুটিও হয়তো প্রতিবারের মতো বাসায় বসে বসে টিভি দেখে আর কম্পিউটারে গেমস খেলতে খেলতে চলে যাবে। কিন্তু খুশির খবর এবারের ছুটিটা কাটবে তাদের গ্রামে। যদিও সে জানে না গ্রাম দেখতে ঠিক কেমন? গ্রামে কী কী আছে? গ্রামে শীতকাল কেমন? কিন্তু তবু তার ভালো লাগে, কারণ সে বইতে গ্রাম নিয়ে অনেক কিছু পড়েছে তার বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছে গ্রামের গল্প। এবার গ্রাম থেকে এসে সেও তার বন্ধুদের গ্রামের গল্প শোনাতে পারবে। তাই সে এখন অপেক্ষা করে আছে কবে যে আগামী সপ্তাহ আসবে।

আবিররা আজ সকালে গ্রামে এসে পৌঁছেছে। আসার সময় তারা ট্রেনে করে এসেছে। সে প্রথমবারের মতো ট্রেনে চড়েছে। সে যে কী মজার! বইতে পড়েছিল ঝকঝকাঝক ট্রেন চলে। কিন্তু ট্রেন মোটেও ঝকঝকাঝক করে চলে না। কেমন যেন আওয়াজ করে চলে, তবে সেটা ঝকঝকাঝক না! আবিরের দাদা-দাদি কেউ বেঁচে নেই। গ্রামে তাদের অনেক বড় বাড়ি। ঢাকায় তারা যে ফ্ল্যাটে থাকে তার চেয়ে অনেক বড়। তার একমাত্র চাচা-চাচি এ বাড়িটায় তাদের তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকে। আবির তার বাবার কাছে তার চাচাত ভাই-বোনদের কথা শুনেছে। ছোটবেলায় দেখেছিল তাদের, কিন্তু তার কিছুই মনে নেই তার। তাই তাদের সঙ্গে ভালোভাবে মিশতে পারছে না সে। কিন্তু এক দিন যেতেই তাদের সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গেল আবিরের। তার চাচাত ভাইয়ের নাম মনির এবং চাচাত দুই বোনের নাম মিনা আর রিনা।

ঢাকা শহরে শীত তেমন নেই, কিন্তু গ্রামে অনেক শীত। সকালে ঘুম থেকে উঠেই আবির মোটা একটা জ্যাকেট পরেছে। রান্নাঘরে গিয়ে দেখে তার চাচি এবং মা মিলে খেজুরের রসের নানা রকম পিঠা বানাচ্ছে। আর পাশে গোল করে বসে পিঠা খাচ্ছে তার চাচাত ভাই মনির এবং চাচাত দুই বোন মিনা আর রিনা। আবিরও তাদের পাশে এসে বসল, বসে পিঠা খেতে লাগল। পিঠা খাওয়া শেষে আবির তার চাচাত ভাই মনিরের সঙ্গে বের হয়েছে নদীর পাড়ে যেতে। নদীর পাড়ে গিয়ে অবাক হয় আবির। কী সুন্দর কুয়াশার চাদরে ঘেরা আঁকাবাঁকা নদী! নদীতে সারি বাঁধা ডিঙি নৌকা। নদীর পাশে সারি সারি গাছ। কত্ত রকমের পাখি উড়ে যাচ্ছে। আবির আর মনির মিলে একটা ডিঙি নৌকা নিয়ে চড়তে লাগল। মনির আবিরের সমবয়সি হলেও সে অনেক দুরন্ত। মনির নৌকা চালাতে জানে। তারা দুজন নৌকা নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়।

আবিররা গ্রামে এসেছে এক সপ্তাহ হয়ে গেছে। এর মধ্যে আবির সাঁতার শিখেছে। নৌকা চালানো শিখেছে। গুলতি চালানো শিখেছে। আবিরের কাছে স্বপ্নের মতো কেটেছে গ্রামের এ কদিন। এ যেন অন্য এক জগৎ। কত্ত রকমের গাছ, কত্ত রকমের পাখি, কী সুন্দর নদী! আবিরের মন যেন আর ঢাকা যেতেই চায় না। গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা মনে পড়লেই মনটা খারাপ হয়ে যায় তার।

 

"