নীতু ও জলপরী

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

এদিকে নীতুর বার্ষিক পরীক্ষা শেষ, বাসায় বসে থাকতে তার একদম ভালো লাগছে না। স্কুল মাসখানেক বন্ধ থাকবে, তাই পড়ালেখার কোনো টেনশন নেই। এখন কোথাও গিয়ে কিছুদিনের জন্য ঘুরে আসতে তার মন চাইছে। ইট-পাথরের কালো ধোঁয়ার শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে স্নিগ্ধ নির্মল বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে ভেতরে ভেতরে ছটফট করছে। তবে সে চাইলেই কী হবে, তার আব্বু ও আম্মুর অফিস যে বন্ধ নেই। তাই বাসার ভেতর বন্দি হয়ে পুরো ছুটি কাটাতে হবে ভেবে নীতুর মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে। ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে ওঠে। রহিমা খালা গিয়ে দরজা খুলে দিল। একটু পর কে যেন এসে পেছন থেকে নীতুর চোখ টিপে ধরে। তারপর তার কপালে চুমু দিতেই নীতু বুঝতে পারে, তার দাদু এসেছে। সে তখন আনন্দ উচ্ছ্বাসে দাদু বলে জড়িয়ে ধরে। দাদু তখন প্রশ্ন করেন, ‘কেমন করে বুঝলে দিদিভাই, আমিই যে তোমার চোখ টিপে ধরেছি?।’ নীতু বলল, ‘তুমি যখন আমার কপালে চুমু দিলে, তখন তোমার মুখে পানের জর্দার গন্ধেই বুঝে গেছি।’ দাদু তখন হু... হু... হা... হা... করে হেসে উঠলেন।

তারপর দাদুর সঙ্গে নীতুর গল্পে আড্ডায় সন্ধ্যা হয়ে এলো। কিছু সময় পরেই নীতুর আব্বু ও আম্মু অফিস থেকে বাসায় ফিরলেন। দাদুকে দেখে তারা খুব খুশি হলেন এবং পায়ে ধরে সালাম করলেন। দাদু সব সময়ই গ্রাম থেকে আসার সময় মজার মজার অনেক খাবার নিয়ে আসেন। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। দাদু তার ব্যাগ থেকে সেগুলো বের করে নীতুর আম্মুর হাতে তুলে দিলেন। খাবারগুলো দেখে নীতুর জিভে পানি জমে উঠেছে। দাদুর নিয়ে আসা খাবারগুলো দিয়েই সন্ধ্যার নাশতা খাওয়া হলো। নীতু বেশ তৃপ্তি নিয়ে পেটভরে খেল। নাশতা খাওয়া সেরে নীতু তার দাদুর কাছে গল্প শুনতে বায়না ধরে। একমাত্র নাতনির বায়না কী আর ফেলতে পারে, তাই গল্প শোনাতে আসন পেতে বসলেন। তারপর তিনি শুরু করলেন জলপরীর গল্প। বহুকাল আগে উনাদের গ্রামের বাড়ির বিশাল বড় একটা পুরোনো দীঘিতে ছিল জলপরীদের বসবাস। দাদুর কোলে মাথা রেখে নীতু খুব আগ্রহ নিয়ে গল্প শুনছে। দাদু বেশ সুন্দর বর্ণনা দিয়ে গল্প বলে যাচ্ছেন আর নীতুর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছেন। গল্প শুনতে শুনতে কখন যে সে ঘুমিয়ে গেল, দাদু টেরই পেলেন না। তিনিও ছিলেন বেশ ক্লান্ত, তাই নীতুকে নিয়ে তিনি বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই ঘুমিয়ে গেলেন।

দাদু দুই দিন থেকে নীতুকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে এলেন। প্রথমে ওর আব্বু-আম্মু গ্রামের বাড়িতে যেতে দিতে না চাইলেও নীতুও ছিল বেশ নাছোড়বান্দা, তাই শেষ মুহূর্তে যাওয়ার অনুমতি দিতেই হলো। নীতু মূলত পুরোনো দীঘির জলপরীদের সঙ্গে দেখা করতেই গ্রামের বাড়িতে এসেছে। তাই সে রাতের অপেক্ষা করতে থাকে, যখন সে চুপিচুপি করে দীঘির পাড়ে যাবে। খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলো না। একটু পরেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমে এসেছে। সবাই খাওয়া দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে গেছে। শুধু নীতু একাই জেগে ছিল। চুপিসারে সে দরজা খুলে বাহিরের দিকে পা বাড়ায়। জলপরীদের সঙ্গে দেখা করতে যাবে, সেই আনন্দ উচ্ছ্বাসে তার মনে কোনো ভয় নেই। গা ছমছম রাতের অন্ধকার গ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে একসময় সে পৌঁছে যায় ওই পুরোনো দীঘির পাড়ে। সেখানে গিয়ে দেখে কোথাও কেউ নেই, একদম সুনসান নীরবতা। সে নীরবতা ভেঙে দিয়ে মধুর স্বরে জলপরীদের ডাকতে থাকে। হঠাৎ করেই দেখতে পায়, দীঘির মাঝখানের পানি আলোকিত হয়ে উঠেছে। সেই আলোর ভেতর থেকে বের হয়ে আসে চারজন জলপরী। তারা দীঘির পানির ওপর নৃত্য করতে করতে চলে আসে নীতুর কাছে। সে সবকিছু দেখে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রয়, তার কাছে যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে।

জলপরীরা নীতুর কাছে এসে বলল, কে গো তুমি ছোট্ট খুকি, ভেঙে দিলে আমাদের শত বছরের ঘুম। তোমার ডাকে সাড়া না দিয়ে পারলাম না। এত মিষ্টি তোমার কণ্ঠস্বর, সেই কণ্ঠে আমাদের ডেকে কী আকুল আহ্বান! নীতু তখন বলল, আমি তোমাদের দেখতেই শহর থেকে গ্রামে এসেছি। ওই যে দেখা যায় তালগাছ, ওখানেই আমার দাদার বাড়ি। ওদের দেখতে শহর থেকে এসেছে শুনে জলপরীরা তখন খুব খুশি হয়। তারা তখন নীতুকে কোলে নিয়ে সারা দীঘিতে নৃত্য করতে থাকে। তাদের নৃত্যের তালে তালে দীঘির পানিতে চোখ ধাঁধানো নানা রঙের আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে। হঠাৎ করেই সারা দীঘিময় হাজার হাজার ফুল ফুটে ওঠে। তখন যেন দীঘিটাকে ঠিক স্বপ্নপুরীর মতো দেখাচ্ছে। নীতু খুব মজা পাচ্ছে আর নীতুর মুখের হাসি দেখে জলপরীরাও মনের সুখে বিরামহীন নৃত্য করতেই থাকে। একসময় ভোর হয়ে আসে, জলপরীরা নীতুর কপালে চুমু দিয়ে বিদায় জানিয়ে চলে যায়। তারা চুমু দেওয়ার সময় তাদের মুখে তার দাদুর মুখের সেই চিরচেনা জর্দার ঘ্রাণ পায়। তখনই তার ঘুম ভেঙে যায় আর তাকিয়ে দেখে সে তার বাসায় বিছানা শুয়ে আছে। পাশেই দাদু তার কপালে চুমু দিচ্ছে। নীতুর কাছে তখন পুরো ব্যাপারটাই যেন রহস্যময় লাগছে।

 

"