লাল সবুজের গল্প

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০

রুহুল আমিন রাকিব

আচ্ছা দাদু আমাদের জাতীয় পতাকার রং লাল ও সবুজ কেন? তানফির কথা শুনে ওর দাদু বলল, সে অনেক বড় ইতিহাস! তুমি কি শুনতে চাও সেই ইতিহাসের গল্প? তানফি বলল, আমি শুনতে চাই সেই গল্প। দাদু বলল, ঠিক আছে তাহলে এখন রুমে যাও বই নিয়ে পড়তে বসো। তোমার পড়া শেষ হলে এসো। আজ রাতে শোনাব সেই ইতিহাসের গল্প। দাদুর কথা শুনে, আনন্দে আত্মহারা হয়ে দৌড়ে ওদের রুমে যায় তানফি। বই নিয়ে পড়তে বসে, আজ খুব তাড়াতাড়ি করে বাড়ির পড়া শেষ করে। সহজ-সরল আর মায়াবী একটা মেয়ে তানফি। নরম তুলতুলে গাল, যে কেউ একটু টেনে আদর করে দেবে, আমি শিওর। এবার ক্লাস টুয়ে পড়ে। স্কুলের স্যার ম্যাম, প্রচ- রকম ভালোবাসে! পড়ালেখায় ওদের ক্লাসে সবার সেরা তানফি। দাদুর কাছে জাতীয় পতাকার লাল-সবুজ রঙের গল্প শোনার জন্য সহ্য হচ্ছে না। ঘড়ির কাঁটা এই মুহূর্তে রাত ৮টা ছুঁইছুঁই। তানফি পড়া শেষ করে, মায়ের অনুমতি নিয়ে দাদুর রুমে যায়। দাদুর পাশে বসে, বলল দাদু ও দাদু এবার বলনা আমাদের জাতীয় পতাকার গল্প। দাদু বলল, ঠিক আছে এবার তাহলে শোন পতাকার লাল-সবুজ রঙের গল্প।

কোথায় থেকে যে বলল! আচ্ছা মনে পড়ছে। এবার তা হলো মন দিয়ে শোন। দাদু বলতে শুরু করল। তখন আমার বয়স ২০ বছর চলছে, তোর দাদিকে নতুন বিয়ে করেছি। আজকের এই বাংলাদেশের নাম ছিল তখন, পূর্ব পাকিস্তান। আর অন্যদিকে আর একটা ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। সব সময় আমাদের ধান, চাল, গম, ভুট্টা, আখ, পাট, সবুজ ফসল। সবকিছু পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যেত। আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের কৃষকরা ওদের কাছে অসহায় ছিল। ন্যায্যমূল্য তো দূরের কথা। আমরা আমাদের তাজা তাজা সবুজ ফসল চাষ করার পরও ঠিকমতো খাইতে পারতাম না। পড়ালেখায় আমাদের সব সময় পিছিয়ে রাখা হতো। পশ্চিম পাকিস্তান, কখন চাই তো না আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের কেউ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হোক। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো জায়গায় পরিচালনা করুক। এমনকি ভালো কোনো কলেজ, বিশ্ববিদ্যালায় ও প্রতিষ্ঠিত করতে দিত না। আমাদের ওপর নানা রকম জোরজুলুম আর অত্যাচার করত সব সময়। তবে এমন করে আর কত দিন চলা যায়! এক সময় আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে উড়তে চায়। নিজেদের ইচ্ছে স্বাধীনমতো রাস্তাঘাটে চলাচল করতে চায়।

নিজস্ব মৌলিক অধিকার আদায় করতে চায়। নিজেদের রোপণ করা ফসল, পণ্যের ন্যায্যমূল্য আদায় করতে সোচ্চার হতে চায়। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে নিজেস্ব স্বাধীন রাষ্ট্র গড়তে চায়।

ঠিক এমন সময় হঠাৎ করে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে শুরু হয় গেরিলাযুদ্ধ।

সেদিন রাতে এখনকার বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। বুলেট, গুলির আঘাতে শত শত মুক্তিকামী মানুষের মৃত্যু হয়। পূর্ব পাকিস্তান দিনে দিনে হয়ে ওঠে মৃত্যুপুরি। যেদিক চোখ যায়; সব দিকে যেন শুধু সারি সারি লাশের মিছিল। দেখতে দেখতে পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে শুরু হয় গেরিলাযুদ্ধ। এমন সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বাংলার সূর্যসন্তান। বাংলার জন্মপিতা শেখ মুজিবুরের জ্বালাময়ী কণ্ঠের ভাষণ শুনে। পূর্ব পাকিস্তানের সব লোক, কামার-কুমার, কৃষক-শ্রমিক তাঁতি-জেলে, তরুণ-তরুণী। সবাই রাজপথে নামতে থাকে। শুরু হয় মহান স্বাধীনতার বিজয় আনতে মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে, পূর্ব পাকিস্তানের হাজার হাজার মা-বোন ধর্ষিত হয়। বাবার সামনে ছেলেকে, স্ত্রীর সামনে স্বামীকে। বুলেট, গুলির আঘাতে হত্যা করে। ছোট ছেলে মেয়ে, এমনকি দুধের শিশুকেও মায়ের বুক থেকে কেড়ে নিয়ে ওদের বুটের নিচে পিষে মেরে ফেলে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় পূর্ব পাকিস্তানের কিছু বেইমান স্বার্থপর, রাজাকার-আলবদর। রাতের আঁধারে শত শত মুক্তিকামী নারী-পুরুষকে একত্রিত করে হাত-পা বেঁধে গুলি করে মেরে গণকবর দেয়। লাখো মৃত্যু মানুষের লাল লাল তাজা রক্তর স্রোত বয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে। আকাশে-বাতাসে উড়ে মানুষের করুণ আত্মচিৎকার। স্বজন হারানোর বেদনাকে শক্তিতে পরিণত করে। বুকে বিজয়ের স্বপ্ন এঁকে হাতের মুঠোয় মৃত্যু নিয়ে এগিয়ে চলে পূর্ব পাকিস্তানের লাখো মানুষ। পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্নে বিভোর থাকে। দেখতে দেখতে ৯ মাস চলে গেল, এলো ডিসেম্বর।

হেমন্তের সকালে, পাখিরা ডেকে উঠল আপন সুরে।

শিশির কণা, আদর ভরা চুমু একে দিল সারি সারি সবুজ গাছে। পুবের কোণে হেসে উঠলো রক্তরাঙা রবি। পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে শুরু হলো আনন্দ-উল্লাস! রেডিও-টিভি আর বেতারে প্রচার করা হলো পূর্ব পাকিস্তানের বিজয়বার্তা! সবাই জেনে গেল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মুক্ত পূর্ব পাকিস্তান। সেদিন ছিল ১৬ ডিসেম্বর। সেদিনের পর থেকে বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নিল নতুন একটি স্বাধীন রাগ্র। সেদিনের পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানের নাম হলো আমাদের এই বাংলাদেশ।

লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে এ দেশ মাটি কেনা বলে। আমাদের এই পতাকার রং লাল। আর সবুজ রঙের কারণ হলো। আমাদের এই দেশ চির সবুজের দেশ, সবুজ গাছের দেশ। সবুজ ফসলের দেশ, এই কারণে আমাদের পতাকার রং লাল ও সবুজের আদলে বানানো।

তানফির দাদু যখন এই গল্প বলছিল। তার মুখে যেন কথার খই ফুটেছিল! গর্ত হয়ে যাওয়া ফোঁকলা দাঁতের মুখে লেগেছিল হাসির ঝিলিক। দাদুর কাছে পতাকার, লাল সবুজের গল্প শুনে চোখের কোণে পানি এলো ছোট তানফির।

চোখের পানি দেখে, কোলে নিয়ে তানফির কপালে আদরমাখা চুমু এঁকে দাদু বলল। এই বোকা মেয়ে কাঁদছো কেন? এই লাল সবুজের বিজয় নিশান এখন তোমাদের হাতে। আগামী দিনে এই লাল-সবুজের হাল ধরতে হবে তোমাকে, তোমার মতো ছোটদের। তোমরা যদি এ দেশকে, এই লাল সবুজের পতাকাকে এগিয়ে নিতে পার সুন্দর আগামী গড়তে। তবেই তো শান্তি পাবে লাখো শহীদের আত্মা। হঠাৎ করে তানফির মা তানিয়া আমিনের ডাক শোনে, দাদুর কাছ থেকে বিদায় নেয় তানফি। আপন রুমে গিয়ে, গ্লাসভর্তি গরুর দুধ খেয়ে ঘুমের জগতে নিজেকে বিলিন করে। মনে মনে বলে, কালকে স্কুলে গিয়ে ওর ক্লাসমেটদের কাছে বলবে। দাদুর বলা লাল-সবুজের এই পতাকার গল্প।

 

"