শালিক ও ময়না

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

মিনহাজ উদ্দীন শরীফ

একদা এক বনে বাস করত একটি শালিক ও একটি ময়নাপাখি। তাদের দুজনের মধ্যে ছিল খুব ভালো বন্ধুত্ব। একজনকে ছাড়া আরেকজন কোনো কিছু ভাবতেই পারত না। এক দিন ময়নাপাখি খাবারের খুঁজে একটি গ্রামে গিয়েছিল। সে গ্রামের মানুষ ময়নাকে দেখে একজন আরেকজনকে বলে দেখ দেখ কত সুন্দর পাখি। এটা আবার মানুষের মতো কথাও বলতে পারে। ময়না দূর থেকে নিজের প্রশংসা শুনে খুবই আপ্লুত। নিজের প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে! ঠিক তেমনিভাবে সেও নিজের প্রশংসা শুনে আনন্দিত। সে আরো কাছ থেকে নিজের প্রশংসা শোনার জন্য লোকগুলোর কাছাকাছি এলো।

এসে বলছে, ওহে, সৃষ্টির সেরা মানুষ। তোমরা আমাকে নিয়ে কী কথাবার্তা বলছ। তাদের মধ্যে একজন লোক বলল। তুমি খুব সুন্দর, সবার নজরকাড়ে তোমার কথা ও রূপ। তোমার কথাবার্তাও খুব মিষ্টি। সে বলে, তাই বুঝি ভাইয়েরা? লোকগুলো বলে, তুমি এত সুন্দর ও আমাদের মতো কথাও বলতে পারো, তাহলে বনে কেন পড়ে আছো? চলে এসো না আমাদের গ্রামে। আমাদের সঙ্গে তুমি থাকতে।

ময়না নিজের প্রশংসা শুনে আত্মগরিমায় ডুবে গেছে। তাই সে ভুলে গেছে পাখিদের যে বনেই সুন্দর মানায়। পাখিদের ধর্মই হচ্ছে স্বাধীনভাবে ডানা মেলে তেপান্তরে মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়ানো। সে কথা ভুলে গিয়ে বলে ঠিক আছে। আমি আজই একেবারে চলে আসব তোমাদের গ্রামে। এখন আমি আসি দুপুরবেলা আসব। তারা বলে ঠিক আছে। দুপুরবেলা এখানেই এসো, আমরাও আসব। ময়না বলে ঠিক আছে ভাইয়ের। তাহলে এখন আমি আসি। এই বলে নীল আকাশে ডানা মেলে উড়ে যেতে যেতে ভাবছে। আমি এত সুন্দর আর আমার কথাবার্তা এত মিষ্টি আর আমি কি না পড়ে আছি এই শালিকের সঙ্গে বনে।

বাসায় গিয়ে দেখে শালিক নেই। সে শালিকের জন্য অপেক্ষা করছে। কল্পনা দেখছে, গ্রামের মানুষ তাকে মাথায় করে রাখছে। আর ভালো ভালো খাবার খেতে দিচ্ছে। কষ্ট করে আর খাবার খুঁজতে হবে না। হঠাৎ শালিক এলো। কাছে এসে দেখল ময়না একা একা কথা বলছে আর লাফালাফি করছে। সে জিগ্যেস করল, কী ব্যাপার বন্ধু আজকে এত খুশি খুশি লাগছে। কোনো সুখবর আছে নাকি? ময়না বলল, হ্যাঁ অবশ্যই খুশির খবর। তবে তোমার জন্য খারাপ খবরও হতে পারে। শালিক উদ্বিগ্ন হয়ে জিগ্যেস করল, কী এমন খবর তোমার জন্য ভালো আর আমার জন্য খারাপ হতে পারে!

সে বলে, আমি দেখতে এত সুন্দর আর আমার কথাবার্তা মানুষের মতো মিষ্টি। তাহলে আমি কেন বনে কিংবা তোমার সঙ্গে থাকব। আমার কথার মতো যাদের কথা মিষ্টি আমি তাদের সঙ্গেই থাকব। শালিক অশ্রুভেজা নয়নে বলে। তাই তো তুমি দেখতে খুব সুন্দর, কথাবার্তাও মিষ্টি। এটা আমি না শুধু জগতের সবাই বলবে। ময়না বলে, এই তো এত দিন পর তুমিও বুঝলে। শালিক বলে তো কোথায় যাবে? সে বলে, আমি মানুষের সঙ্গে থাকব। শালিক বলে, এত দিনের বন্ধুত্ব ভেঙে চলে যাবে কি? সে বলে, দরকার হলে তাই করব। আমাকেও নিয়ে যাও তোমার সঙ্গে। সে বলে, আমি পাগল নাকি তোমার মতো কুৎসিত একটা শালিককে আমার সঙ্গে নেবো। সে বলে, তাহলে কেন, আমি জানি তোমার বিপদ হবে মানুষের কাছে গেলেই। মানুষ পাখিদের খাঁচায় বন্দি করে রাখে। এটাই চিরন্তন সত্যি কথা। তোমাকেও তারা বন্দি করে রাখবে। তাই আমিও চেয়েছিলাম সুখে-দুঃখে তোমার সঙ্গে থাকতে।

ময়না বলে, তোমার মতো তারা এত হিংসুটে না। অন্যের ভালো দেখতে পারো না। হিংসায় আজেবাজে বকে যাচ্ছ। শালিক বলে, আমি তোমার ভালো চাই। কখনো খারাপ চাই না। ময়না বলে, আমার ভালোমন্দ নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। নিজের চিন্তা করো। আমি এখনই চলে যাবো সেই গ্রামে মানুষের কাছে। শালিক বলে, বন্ধু এমন ভুল করো না। তুমি যেও না তাদের কাছে গেলেই বন্দি করে রেখে দেবে। সে বলে, সেটা আমি ভালো জানি কী করবে। এই বলে উড়ে গেল। শালিকও গেল তার পিছু পিছু। ময়না একটা বড় জারুলগাছে বসে। শালিক তার চেয়ে দূরে একটা গাছে বসে। ময়নাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য মানুষগুলো এলো। শালিক তাদের দেখেই চিনেছে তারা যে শিকারি। সেদিন তাকে ধরার জন্য ফাঁদ পেতেছিল। শিকারিরা ময়নাপাখিকে খাবারের লোভ দেখিয়ে কাছে নিয়ে গেল। যেই না ময়না খাবার খেতে লাগল। তখনই শিকারি ধরে খাঁচায় বন্দি করে দিল। ময়না বলে, আমাকে খাঁচায় কেন রাখছ ভাইয়েরা। আমাকে বাহির করো আমার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। শিকারি বলে, এই খাঁচাই তো তোমার আসল ঠিকানা। ময়না বলে, এভাবে আমাকে ধোঁকা দিলে ভাইয়েরা। আমি নিজের প্রশংসা শুনে অন্ধ হয়ে গেছিলাম। নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনলাম। শালিকের কথা শুনলে এভাবে বন্দি হয়ে থাকতে হতো না। শালিক দূর থেকে বলে, নিজের প্রশংসা নিজে শুনে বিভোর হলে শেষ পরিণতি এমনই হয়। মূল কথা; আমরা অন্যের মুখে নিজের প্রশংসা শুনে বিভোর হব না। কারণ, যে সামনাসামনি প্রশংসা করে, সে তোমাদের প্রকৃত বন্ধু না, সে আমাদের শত্রু। যে আমাদের দোষ, গুণ, কাজ নিয়ে সমালোচনা করে; সে আমাদের প্রকৃত বন্ধু।

"