দাদির সেবা

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

আবদুস সালাম

হানি ও সাওদা ওরা দুজন ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। একই ক্লাসে পড়ে। একই বেঞ্চে বসে। একজন দেরি করে ক্লাসে এলে অন্যজন তার জন্য ক্লাসের বেঞ্চে জায়গা রেখে দেয়। যতক্ষণ পর্যন্ত স্কুল ছুটি না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তারা একসঙ্গেই থাকে। কেউ কারোর বিষয়ে হিংসা করে না। ক্লাসের পড়াগুলো একে অপরের সঙ্গে শেয়ার করে। এর ফলে তারা পড়াশোনায় দিন দিন উন্নতি করতে থাকে। তাদের পরীক্ষার ফলাফলও ভালো। ইদানীং হানির মনটা ভালো যাচ্ছে না। কারণ তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী সাওদা কয়েক দিন ধরে স্কুলে আসছে না। দুজনের বাড়ি দুই জায়গায়। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তারা যখন-তখন একে অপরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারে না। সুমি নামে তার এক বান্ধবীর কাছ থেকে হানি সাওদাদের বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করেছে। সে মনস্থির করেছে আগামী শুক্রবার সাওদাদের বাড়িতে গিয়ে তার খোঁজখবর নেবে।

দেখতে দেখতে শুক্রবার চলে আসে। মায়ের অনুমতি নিয়ে হানি সাওদাদের বাড়িতে যায়। সাওদা তখন দাদিকে ওষুধ খাওয়ানোর কাজে ব্যস্ত ছিল। হানিকে দেখে সাওদা খুশি হয়। দুজন ড্রয়িংরুমে বসে একে অপরের খোঁজখবর নেয়। কদিন ধরে তোকে স্কুলে দেখছি না। তাই তোর খোঁজ নিতে এলাম। এখন বল, কী হয়েছে? হানির প্রশ্নের উত্তরে সাওদা বলে, আমার দাদি পক্ষঘাতগ্রস্ত রোগী। বিছানা থেকে উঠতে পারে না। দাদির শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। তাই হাসপাতালে দাদিকে ভর্তি করা হয়েছিল। গতকাল সুস্থ হয়ে বাসায় এসেছে। দাদিকে দেখাশোনা করার জন্য মা দাদির কাছে থাকত। আর আমি ছোট ভাইকে নিয়ে বাসায় থাকতাম। বাবা সব সময় অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকে। এজন্য আমি স্কুলে যেতে পারিনি। তবে আগামীকাল থেকে স্কুলে যাব। স্কুলের পড়াশোনা নিয়ে যখন তারা আলাপ আলোচনা করছিল ঠিক তখন হানি লক্ষ করে সাওদার বাবা বাথরুম থেকে কিছু কাপড়চোপড় কেচে বের হয়ে আসছে। হানি বুঝতে পারে সেগুলো সাওদার দাদির কাপড়চোপড়। ধৌতকরা কাপড়গুলো সাওদার বাবা সুন্দরভাবে বারান্দায় মেলে দেয়ে। সাওদা বাবার সঙ্গে হানিকে পরিচয় করিয়ে দেয়। কুশলাদি বিনিময় করে তার বাবা ঘরের ভেতরে চলে যায়।

সাওদাকে কয়েকটি কথা জিজ্ঞাসা করার জন্য হানির কৌতূহল হলো। সে বলল, এই তোদের বাড়িতে কাজের বুয়া নেই? হ্যাঁ, আছে তো। তাহলে তোর আব্বা দাদির কাপড়চোপড় কাচল যে? ও আচ্ছা। তোকে তো বলেছি আমার দাদি পক্ষঘাতগ্রস্ত রোগী। বিছানা থেকে উঠতে পারে না। সে কারণে দাদি মাঝে মাঝে বিছানায় প্রস্রাব-পায়খানা করে ফেলে। আব্বা দাদির মলমূত্রযুক্ত কাপড়গুলো কাউকে কাচতে দেয় না। নিজেই কাচে। যখন সময় পায় তখনই। অফিস যাওয়ার আগে হোক বা পরে হোক। আমিও মাঝে মাঝে দাদির কাপড়চোপড় কেচে দিই। দাদির কোনো কষ্ট হোক আমরা কেউ তা চাই না। জানিস আব্বা দাদিকে খুব ভালোবাসে। সব সময় খেয়াল করে মায়ের যেন কষ্ট না হয়। দাদি আমাকে ছোটবেলায় খুব আদর করত। অসুস্থ হওয়ার কারণে দাদি তেমন করে আর আদর করতে পারে না। তবে আমাদের জন্য সব সময় দোয়া করে। আমিও দাদির জন্য দোয়া করি। সুযোগ পেলে দাদির সেবাযতœ করি। কিছুক্ষণ পর সাওদার মা হানির জন্য নাশতা নিয়ে আসে। খাওয়া-দাওয়া শেষে কিছুটা বিশ্রাম করে হানি বাসায় ফিরে যায়।

সাওদাদের বাড়ি থেকে বাসায় আসার পর হানির মনটা খারাপ হয়। তার দাদির কথা খুব মনে পড়ে। সাওদার দাদির মতো তার দাদিও বিছানায় পড়েছিল। প্রায় বছর পাঁচেক আগে তার দাদি মারা গেছে। তার মনে পড়ে চিকিৎসার জন্য দাদি একবার গ্রাম থেকে ঢাকাতে এসেছিল। তাদের বাড়িতে কিছুদিন ছিল। তখন সে ছোট ছিল। দাদি বিছানায় মলমূত্র ত্যাগ করত বলে কেউ দাদিকে পছন্দ করত না। সে নিজেও দাদিকে এড়িয়ে চলত। এক দিন তার বাবা ছোট চাচাকে ডেকে এনে দাদিকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। বিছায় মলমূত্র ত্যাগ করত বলে চাচা-ফুফুরাও দাদিকে ঠিকমতো দেখাশোনা করত না। অবশেষে দাদিকে নিয়মিত দেখাশোনা করার জন্য দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়কে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তার সেবাযতেœ দাদি বেশ কিছুদিন ভালো ছিল। মৃত্যুর আগে দাদিকে অনেক দিন কষ্ট করতে হয়েছে। দাদির কষ্টের কথা স্মরণ করে হানির দুচোখ সজল হয়ে ওঠে।

কদিন আগে হানিদের ধর্ম স্যার ‘বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব কর্তব্য’ বিষয়ে ক্লাস নিয়েছে। স্যারের কাছ থেকে তারা জেনেছে ইসলামের দৃষ্টিতে পিতা-মাতাকে কষ্ট দেওয়া কোনোভাবেই বৈধ নয়। সন্তান যদি একনিষ্ঠতার সঙ্গে আল্লাহতাআলার ইবাদত করার পাশাপাশি পিতা-মাতার সেবাযতœ, খেদমত এবং উত্তম আচরণ করে; তবে সে দুনিয়া ও পরকালে মহাসফলতা লাভ করবে। আল্লাহতায়ালা তার ইবাদতের পর সন্তান-সন্ততির জন্য পিতা-মাতার আনুগত্য করার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কোনো একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদের ‘উহ’ শব্দটিও বল না এবং ধমক দিও না এবং তাদের সঙ্গে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো।’ এক ব্যক্তি মহানবীকে (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, সন্তানের ওপর পিতা-মাতার হক কী? উত্তরে তিনি বললেন, তারা উভয়েই তোমার জান্নাত অথবা জাহান্নাম। অর্থাৎ যারা পিতা-মাতার প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে, তারা সফলকাম। আর যারা তাদের অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে তাদের জন্য লাঞ্ছনা। আল্লাহপাক তার ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গে পিতা-মাতার প্রতি উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। স্যার আরো বলেন, মহানবী (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। মানুষের মাঝে ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা, দয়া ও সহযোগিতার মূলভিত্তি হচ্ছে আত্মীয়তার সম্পর্ক। এ সম্পর্ক নষ্ট হলে সমাজ উচ্ছন্নে যাবে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’

ধর্ম স্যারের কাছ থেকে হানি অনেক কিছু শিখেছে। সে শিখেছে কীভাবে মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়। দাদি আজ বেঁচে নেই। এ জন্য তার খুব কষ্ট হচ্ছে। দাদির সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে পারেনি বলে সে মনে মনে অনুতপ্ত। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, এখন থেকে সব আত্মীয়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। মা-বাবার সঙ্গে সে আর কখনো খারাপ ব্যবহার করবে না। মা-বাবাকে যদি বৃদ্ধ অবস্থায় পায়; তাহলে সে তাদের পাশে থেকে সেবাযত্ন করবে। উত্তম ব্যবহার করবে। মা-বাবা কষ্ট পাবে- এমন কোনো কাজ সে কখনো করবে না।

"