কার্তিকের ভোরে

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

ফারুক হোসেন সজীব

এখনো ভোর হয়নি। চারদিক অন্ধকার ঝাপসা। কার্তিক মাস শুরু হয়েছে সপ্তাহখানেক আগে। এর মধ্যেই শীত শীত ভাবও চলে এসেছে প্রকৃতিতে। তাই ভোরে কুয়াশা পড়ে। শিশিরে ভিজে যায় সবুজ ঘাসের ডগা। দেখতেও কী সুন্দর স্বচ্ছ স্ফটিক কাচের মতো চিকচিক করে। কিন্তু এখনো ভোর হয়নি।

মা বললেন, তোর বাবার জন্য ভাত নিয়ে যেতে হবে যে তনু? কাল সেই দুপুরে তোর বাবা একটুখানি ভাত খেয়ে বেরিয়েছেন। ছোট্ট তনু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, বাবা এত কষ্ট করে কেন মা? না খেয়ে থাকে কত দিন! মা তনুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, আমাদের জন্যই কষ্ট করেন। আর তোর বাবা যে রাতে মানুষের জমিজমা আর খেত পাহারা দেন।

কেন খেত পাহারা দেন? গ্রামে অনেক দুষ্টু খারাপ মানুষ আছে। তারা মানুষের খেতের ফসলগুলো নষ্ট করে ফেলে। কৃষকদের কষ্ট দেয়। এজন্য গ্রামের মানুষ তোর বাবাকে খেত পাহারার দায়িত্ব দিয়েছে। তনু মায়ের দিকে অবাক চোখে তাকায়। তারপর মাকে বলে, রাতে তো ভূত-প্রেত থাকে, যদি বাবার কিছু একটা হয়ে যায়? মা একটু হেসে বলেন, কিচ্ছু হবে না বাবা! তুই এত চিন্তা করিস না। ছোট্ট তনু তবু মায়ের কথায় খুশি হতে পারে না! কারণ তনু গ্রামের বৃদ্ধ মানুষের কাছ থেকে শুনেছে বিলের ঝিলে ভূত-প্রেত থাকে। আর তাছাড়া বিলের ভেতরে একটি শ্মশানও আছে। সেই শ্মশানে একটা পুকুর আছে, সেটা নাকি আরো ভয়ের। মা তনুর হাতে একটি টিফিন ক্যারিয়ার ধরিয়ে দেন। বলেন, শিগগিরই যাবি কিন্তু!

মানুষটা দুবেলা না খাওয়া। তনু ছোট্ট হাতে টিফিন ক্যারিয়ারটি ধরে। মা বলেন, দৌড়াবি না। টিফিন ক্যারিয়ারে ডাল-ভাত আছে। তনু মায়ের কথায় মিষ্টি হাসে। তারপর সে রওনা হয়।

বাড়ি থেকে একটু দূরেই একটি বিশাল বাঁশঝাড়। ঝাড়ের দুপাশ থেকে বাঁশ এসে একটি সরু গলির রাস্তার মতো হয়ে আছে। মাথা নিচু করে যেতে হয়। কিন্তু ছোট্ট তনুর কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সে দিব্যি তাইরে-নাইরে গান গেয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ একটু খসখসানি শব্দ হলো। মনে হলে বাঁশঝাড়ের আড়ালে কী একটা নড়ে উঠল। তনুর হাতে খাবার। তনু জানে, খাবার নিয়ে জঙ্গলে গেলে নানা রকমের বিপত্তি ঘটে। কিন্তু ওসবে কান দিতে নেই। তনু যেমন হেঁটে যাচ্ছিল, তেমনি হেঁটে গেল। তনু এখন বাঁশঝাড় থেকে বের হয়ে এসেছে। এখন সে সবুজ মাঠের আউল দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। চারিদিকে সবুজ গম আর জবের খেত।

শিশিরে চকচক করছে। তনু একটু হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিল। হাত ভিজে গেল। শরীরও শিরশির করে উঠল। উহ্ শব্দ করে হাতটি সরিয়ে নিল। সামনে এত কুয়াশা ভালো করে দেখাও যায় না।

তনু গুনগুন করছে। কিন্তু মুখের ভেতরে শীত ঢুকে গেছে বোধহয়। তাই মুখের দুপাটি দাঁতের সঙ্গে দাঁত লেগে

অ্যাঁ অ্যাঁ-খুটখুট শব্দ হচ্ছে। সামনেই সেই শ্মশান ঘাট। শ্মশান ঘাঁটি পার হতে পারলেই আর ভয় নেই। তনু ভাবে, শ্মশান ঘাটের কাছে এসেই সে দিবে এক দৌড়। পরক্ষণেই মায়ের কথা মনে পড়ল। টিফিন ক্যারিয়ারে ডাল-ভাত আছে। তনু আস্তে আস্তে গুটিগুটি হয়ে হেঁটে যাচ্ছে। হঠাৎ কানের কাছে ভেসে এলো একটি কণ্ঠস্বর... কে যায়? তনু চমকে উঠল! পেছনে ফিরে তাকাল। বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। দেখতে পেল একটা বৃদ্ধ ঠিক তার দুহাত পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে। বৃদ্ধটির কুঁজো হয়ে ঝুঁকে রয়েছে।

তনু বলল, কে আপনি?

বৃদ্ধ লোকটি এবার তার চাদরের গোমটাটা খুলেই পান খাওয়া ফোকলা দাঁতে হেসে উঠল। বলল, ডরাইছ বাবা? ডরাইওনা। আমি তোমাগো গায়েই থাকি। সেই মধ্যপাড়াতে আমার বাড়ি। এখন অবশ্য এইখানেই থাকি। তোমার বাপ আমারে চেনে। তুমি ফয়েজউল্লার ছেলে না? তনু বৃদ্ধ লোকটির দিকে তাকিয়ে ভয়ে মাথা নেড়ে হু হু করল।

তয় চলো যাই... এক সঙ্গেই হাঁটি। তনু বলল, কিন্ত আপনি কোথায় যাবেন? এই সমনেই যাব বাছা। তনু হেঁটে যাচ্ছে সামনে। পেছনে বৃদ্ধ লোকটি। তনুর ভীষণ ভয় ভয় করছে। তনু বারবার পেছন ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে। হঠাৎ তনু থেমে গেল। কী হলো বাছা, তুমি থামলে কেন হঠাৎ? ছোট্ট তনু বলল, আপনি আমার সামনে সামনে হাঁটুন আমার ভয় করছে। বৃদ্ধ লোকটি বলল, সেকি কথা বাছা! আমি বৃদ্ধ মানুষ, কুঁজো হয়ে হাঁটি। আমার কি আর গায়ে অত জোর আছে যে, তোমার সামনে হাঁটব?

তনু আর কিছু বলল না। সে সামনে জোরে জোরে হাঁটছে। মনে মনে ভাবছে, গোল্লায় যাক লোকটি। আমি আমার মতোই হাঁটব। তনু প্রথমে জোরে জোরে হাঁটল তারপর টিফিন ক্যারিয়ারটা সাবধানে ধরে অনেকটা দৌড়ের মতো হাঁটছে। তনুর মুখে বিজয়ের হাসি সে লোকটিকে অনেক পেছনে ফেলে এসেছে। তনু পেছনে তাকাল, কিন্তু একী! বৃদ্ধ কুঁজো লোকটি যে তার একটু কাছেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। তনু ভয়ে অস্থির হলো। কুঁজো লোকটি ফোকলা পান খাওয়া দাঁতে হাসছে। তনুর পা দুটি অসাড় হয়ে গেল। ভয়ে কাঁপতে লাগল। তারপর ওরে বাবা-রে, মা-রে বলে তনু দৌড়াতে লাগল। দৌড়ানোর সময় তার কিসের ডাল কিসের ভাত কিচ্ছুটি মনে এলো না। তারপর সে এক দৌড়ে পৌঁছে গেল বাবার ছাউনি ঘরে। দেখল, বাবা ঘরের ভেতরেই বসে বসে পাটের দড়ি পাকাচ্ছেন। তনুকে দেখে বাবা তো অবাক!

কীরে তনু? এত সকালে? তনু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, মা ভাত পাঠাইছে বাবা! জলদি খায়া লয়।

বাবা অবাক হয়ে তাকাল তনুর দিকে। বলল, কিন্তু তুই হাঁপাচ্ছিস ক্যান বাবা?

তনু শ্মশান ঘাটের দিকে আঙুল তুলে বলল, ভয় পাইছি বাবা। আমার পেছন পেছন একটা কুঁজো বৃদ্ধ লোক আসছিল। আমাকে বলল কি না চেনে। তোমাকেও চেনে। আমি ভয়ে দৌড়ে তোমার কাছে এলাম। বাবা তনুকে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলালেন, আর বললেন, বৃদ্ধ লোকটি দেখতে কী গোলগাল? হ্যাঁ বাবা আর মুখে দাঁত নেই। পান খেয়ে ঠোঁট লাল। আমার দিকে চেয়ে হাসছিল। বাবা তনুকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ওটা তোর নন্দ দাদু! গত পরশুদিন শ্মশানে উনাকে পোড়ানো হয়েছিল।

শুনে তনুর মুখটা হ্যাঁ হয়ে গেল। সে বাবাকে জাপটে ধরে ভয়ে কাঁপচ্ছিল। বাবা বললেন, আমি আছি তো বাবা! ভয় কীসের? ঠিক আছে আমি তোর নন্দ দাদুকে বলে দেব, তিনি যেন আর তোকে ভয় না দেখান। কেমন?

তনু তবু বাবাকে জাপটে ধরে ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল!

"