কাঠুরিয়া ও লালপঙ্খি

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

আবদুস সালাম

অনেক দিন আগের কথা। হীরাঞ্চল নামে এক দেশ ছিল। সেই দেশের রাজধানীর নাম ছিল স্বর্ণচুর। রাজধানীর একপাশে ছিল একটা বন। অপর পাশে ছিল একটা নদী। হীরাঞ্চলে একবার বড় ধরনের বন্যা হয়েছিল। সেই বন্যায় দেশের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বন্যার পানিতে অনেক ঘরবাড়ি, গাছপালা ও খেতের ফসল ভেসে যায়। স্বর্ণচুরের বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়। খোদ রাজপ্রাসাদের মধ্যেও পানি ঢুকে যায়। ফলে রাজকর্মচারীর দিশাহারা হয়ে পড়ে। তারা যে যার মতো প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত থাকে। বন্যায় রাজপ্রাসাদের অনেক ক্ষতি হয়। মূল্যবান অনেক জিনিসিপত্র পানিতে ভেসে যায়। সেই পানিতে একটা সোনার বাক্স ভেসে গিয়েছিল। বাক্সটি স্বর্ণালঙ্কারে পরিপূর্ণ ছিল। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর রাজকর্মচারীরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সেই বাক্সটির সন্ধান পায়নি। এত বড় ক্ষতি হওয়ায় দেশটির বাদশাহ খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে। ভবিষ্যতে এ রকম যেন ক্ষতি না হয়, তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। তারপর থেকে অবশ্য বন্যায় স্বর্ণচুরের আর কোনো কক্ষতি হয়নি।

রাজধানী স্বর্ণচুরের নিকটে একটা বড় বন আর একটা বড় নদী থাকায় এর আশপাশে বিভিন্ন পেশার লোকজনরা বাস করত। এর মধ্যে কাঠুরিয়া, জেলে, মৌয়াল, কামার, কুমার, তাঁতি ও ছুতোর ছিল অন্যতম। বনের পাশে দাইয়ান নামে দরিদ্র এক কাঠুরিয়া বাসকরত। সে বন থেকে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করত। কাঠ বিক্রি করে যা পেত তা দিয়ে কোনোরকমে সংসার চালাত। কাঠুরিয়া যেমন ছিল নির্লোভ, তেমন ছিল দয়ালু। সে বনের কাঠ ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি নজর দিত না। বনের ভেতরে নানা ধরনের পাখিদের দেখা মিলত। সুন্দর সুন্দর পাখিদের দেখলে সকলের নয়ন জুড়িয়ে যেত। শিকারিরা সেসব পাখি শিকার করার জন্য সারা বন চষে বেড়াত। তারা বনের আশপাশে থেকে পাখি শিকার করে আবার চলে যেত। এক দিন লাল রঙের সুন্দর একটা পাখি গাছের ডালে বসে মনের সুখে গান করছিল। পাখিটি একজন শিকারির নজরে পড়ে। সে পাখিটির দিকে তাক করে একটি তীর ছোড়ে। সেই তীরটি পাখিটির একটি ডানায় আঘাত করে। আহত লালপঙ্খি বাঁচার জন্য ওড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। কিছুটা পথ যাওয়ার পরই নিচে পড়ে যায়। কিছুদিন পর কাঠুরিয়ার জন্য লালপঙ্খির মনটা পুড়তে থাকে। সে মনে মনে বলল, আগামীকালই আমি কাঠুরিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যাব। পরদিন লালপঙ্খি কাঠুরিয়ার বাড়িতে গেল। কাঠুরিয়া তাকে দেখে খুব খুশি হলো। দরিদ্র কাঠুরিয়ার প্রতি পাখিটির দয়া হলো। সে বলল, তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ। আমি তোমার জন্য কিছুই করতে পারিনি। আজ তোমাকে একটা গুপ্তধনের সংবাদ দেব। তুমি যদি তা সংগ্রহ করতে পার, তাহলে সারা জীবন তোমাকে আর কিছু করতে হবে না।

-কী বলছ তুমি! কোথায় সেটা?

-সেই গুপ্তধন একটা সোনার বাক্সে রয়েছে।

-বলো। সেই বাক্সটি এখন কোথায়? সেটি কীভাবে পাওয়া যাবে?

-তোমাকে সব বলছি। মনোযোগ দিয়ে কোনো। বনের শেষপ্রান্তে নদীর ধারে বড় একটি গাছ রয়েছে। সেই গাছটির গোড়ার আশাপাশে বাক্সটি রয়েছে। তুমি খুঁজলে অবশ্যই পাবে।

-তুমি এসব কীভাবে জানলে?

-তা অনেক দিন আগের কথা। আমার দাদা তার দাদার কাছ থেকে এই বাক্সটির সংবাদ জেনেছিল। বংশপরম্পরায় আমি এই সোনার বাক্সের কথা জেনেছি। এই বাক্সটি নাকি কোনো রাজ্য থেকে বন্যার পানিতে ভেসে আসে। বাক্সটি একটা ঝোপঝাড়ে আটকে ছিল। কালক্রমে সেটি গাছপালা ও মাটিতে ঢেকে যায়। আমি সেই স্থানটি চিনি। তোমাকে দেখিয়ে দেব।

-তা বেশ। এখন বলো। কবে আমাকে নিয়ে যাবে? আর কীভাবে সেটি উদ্ধার করব?

-এসব নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। তুমি শুধু একটা নৌকা জোগাড় কর। আমি সেই স্থানটি চিনিয়ে দেব। আর হ্যাঁ। তুমি যখন যাবে তখন তোমার সঙ্গে একটা কোদাল, কুড়াল ও আগুন জ্বালানোর মতো কিছু সরঞ্জামাদি রেখে দিও। সাবধান! কেউ যেন জানতে না পারে।

কয়েক দিনের মধ্যে কাঠুরিয়া সবকিছু ঠিকঠাক করে ফেলল। লালপঙ্খির কথামতো নির্দিষ্ট দিনে ভোরবেলায় কাঠুরিয়া আর লালপঙ্খি যাত্রা করল। দুপুরের মধ্যে তারা নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গেল। জায়গাটি ছিল নির্জন নিস্তব্ধ। কাঠুরিয়ার তখন গা ছমছম করছিল। লালপঙ্খি গাছপালায় ঢাকা একটা স্থান দেখিয়ে বলল, এখানেই রয়েছে সেই সোনার বাক্স। জায়গাটি পরিষ্কার করে খোঁজাখুঁজি করলেই সেটি পেয়ে যাবে। সন্ধ্যার পূর্বেই কাঠুরিয়া সেই স্থানের সব গাছপালা কেটে ফেলে। কোদাল দিয়ে কিছু মাটি খুঁড়তেই তার চোখে পড়ে স্বর্ণের বাক্সটি। বাক্সটি পেয়ে কাঠুরিয়া ও লালপঙ্খি যারপরনাই খুশি হয়। স্বর্ণের বাক্সে একটা সিলমোহর দেখে কাঠুরিয়া বুঝতে পারে এটি হীরাঞ্চলের। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল- সেটি হীরাঞ্চলের রাজভা-ারে জমা দিয়ে দেবে। কাঠুরিয়া সোনার বাক্সটি নিয়ে বাদশার সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। যেতে যেতে রাত হয়ে গেল। জ্যোৎস্না রাত হওয়ার কাঠুরিয়ার পথ চলতে সমস্যা হয়নি। অবশেষে ভোরবেলায় কাঠুরিয়া রাজধানী স্বর্ণচুরে পৌঁছে যায়।

সোনার বাক্স নিয়ে দাইয়ান কাঠুরিয়া বাদশার সঙ্গে দেখা করল। সে সব ঘটনা বাদশাকে খুলে বলল। সে বলল, এই সোনার বাক্স আমি উদ্ধার করলেও এটি আমার সম্পদ নয়। এটা হীরাঞ্চলের সম্পদ। দয়া করে এটি গ্রহণ করে আমাকে মুক্তি দিন। বাদশার লোকজনরা বাক্স ভেঙে দেখে সত্যি সত্যিই সেটি দামি দামি স্বর্ণালঙ্কারে পরিপূর্ণ। সবকিছু দেখে বাদশা বলে, এই সোনার বাক্সের কথা আমি আমার পিতা মহের কাছে শুনেছি। এটা বন্যার পানিতে ভেসে গিয়েছিল। আজ সেটি নিজের চোখে দেখতে পেয়ে আমার বড়ই আনন্দ হচ্ছে। আর কাঠুরিয়ার সততা দেখে আমি খুবই মুগ্ধ। এ রকম সৎলোক আমার দেশে বাস করে তা আমার জানা ছিল না। আমি তার জন্য গর্বিত। বাদশা সন্তুষ্ট হয়ে কাঠুরিয়াকে সততার পুরস্কার হিসেবে বেশ কিছু স্বর্ণালঙ্কার দিয়ে দিলেন। এছাড়াও বাদশা দাইয়ানকে হীরাঞ্চলের রাজভান্ডারের ‘প্রধান রক্ষক’ এর চাকরি দিলেন। বাদশা এও ঘোষণা দিলেন যে, আজ থেকে হীরাঞ্চলের কোনো বন থেকে কোনো লালপঙ্খিকে শিকার করা যাবে না। যদি কেউ শিকার করে, তাহলে তার মৃত্যুদ- দেওয়া হবে। রাজভা-ার দেখাশোনা করার চাকরি পেয়ে দাইয়ান কাঠুরিয়া সপরিবারে রাজপ্রাসাদে বসবাস করার সুযোগ পেয়ে যায়। এভাবেই কাঠুরিয়ার বাকি জীবন সুখে-শান্তিতে কাটে।

 

"