খেঁকশিয়াল

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

ফারুক হোসেন সজীব

রুহান আর বাদল ওরা চাচাতো ভাই। স্কুল ছুটির পর ওরা বাড়িতে এসেই, দু-চারটে খেয়ে-দেয়ে বেরিয়ে পড়ে। কোথায় যায় ওরা? কোথায় আর যাবে! বাড়ির পাশে যে জঙ্গলটি আছে সেখানেই ওরা যায়। জঙ্গলটা পার হয়ে নাক বরাবর একটু সামনে গেলেই সেখানে কাশবনের উঁচু উঁচু ভিটে জমি। বর্ষার সময় অবশ্য জমিগুলোতে একটুও পানি ওঠে না। কিন্তু জমিগুলোর চারদিকেই পানি থৈ থৈ করে। এ সময় জঙ্গলে আর ওই কাশবনের জমিগুলোতে কত রকম প্রাণী যে দেখা যায়। তার ইয়াত্তা নেই। সারা বছর প্রাণীগুলো কোথায় থাকে কে জানে? রুহান আর বাদল তাই জঙ্গল আর কাশবনের জমিগুলো চড়িয়ে বেড়ায়। সন্ধ্যা অবধি ওরা টোটো করে ঘুরে বেড়ায়। ঘুরতে ঘুরতে যখন ওদের খুব ক্ষুধা লাগে। তখন ওরা ওদের কাছে গামছাতে বেঁধে রাখা চিড়ামুড়ি আর খই খায়।

আজও ওরা বের হয়েছে জঙ্গলের অভিমুখে। জঙ্গলটা ভেদ করে ওরা যেই না কাশবনের জমিগুলোতে ঢুকল হঠাৎ ওরা খ্যাকÑ খ্যাক আর কুই কুই শব্দ শুনতে পেল। রুহানের হাতে আছে একটি কাস্তে। কাস্তেটি দেখতে একদম বাঁকা চাঁদের মতো। আর বাদলের হাতে আছে একটি বড় কাঠের লাঠি। লাঠিটি বেশ মজবুত। প্রতিদিন বাদল লাঠিটার গায়ে সরষের তেল মাখে। এতে নাকি লাঠিটা দেখতে আয়নার মতো চকচক করে। বাদল ওর লাঠি দিয়ে কাশবন জঙ্গলের ভেতরে রাস্তা তৈরি করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ খ্যাক খ্যাক শব্দটি শুনে দাঁড়িয়ে গেল। রুহান বলল, কীসের শব্দ রে ভাই?

বাদল এদিক-ওদিকে কান খাড়া করে শব্দের উৎস বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছু বুঝতে পারল না! রুহান বলল, তাহলে বোধহয় সাপে ব্যাঙ ধরেছে! এই কাশবনের জমিগুলোতে তো সাপ-ব্যাঙের হিড়িক।

আরে নাহ্! এই শব্দটি মোটেও সাপে ধরা ব্যাঙের না। অন্যরকম মনে হলো।

তাহলে কীসের শব্দ ভাই?

বাদল আশপাশে কান খাড়া করে আছে শব্দটি আবার শোনার জন্য। কিন্তু শব্দটি তো আর শোনা যাচ্ছে না! ব্যাপার কী? হঠাৎ রুহান বলল, ভাই ওই খানে কী যেন নড়ছে! বাদল বলল, চল তো গিয়ে দেখি!

রুহান আর বাদল সেদিকেই হেঁটে গেল। কিন্তু একি?

এ যে একটি মস্তবড় গর্ত? রুহান বলল, এত বড় গর্ত? বাদল বলল, গর্ত না বলে ডেরা বলাই ভালো। কিন্তু ডেরার ভেতরে তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। বাদল বলল, রুহান তুই তোর কাস্তেটা দিয়ে ভালো করে ডেরার চারপাশটা একটু পরিষ্কার করে ফেলত ভাই।

আমি ভেতরটা দেখছি। রুহান আশপাশটা পরিষ্কার করতে লাগল। বাদল বলল, আরে Ÿস! এই হলো ঘটনা? রুহান বলল, কী হয়েছে ভাই?

আর বলিস না ডেরার মধ্যে একটি খেঁকশিয়াল শুয়ে রয়েছে। কিন্তু খেঁকশিয়ালটার পা ভেঙে একেবারে লুলা হয়ে গেছে। আর পা দিয়ে টপটপ রক্তও পড়ছে। মনে হচ্ছে অন্য কোনো প্রাণী ওকে আক্রমণ করেছিল। রুহান কাস্তে হাতে ডেরার মধ্যে লাফ দিয়ে নামল। দেখল, সত্যি তাই একটি খেঁকশিয়াল আহত অবস্থায় মাটিতে শুয়ে ব্যথায় ক্যাত ক্যাত করছে! রুহান বলল, এখন কী করবি ভাই? বাদল মাথা চুলকাতে লাগল। সত্যি তো কী করা যায় এই অবস্থায়! বাদল বলল পেয়েছি উপায়। ওর প্রাথমিক চিকিৎসা করতে হবে। কীভাবে?

আরে বদল! এই-এইগুলো দিয়েই? বাদল আশপাশে লকলক করে লতিয়ে ওঠা কিছু দূর্বাঘাস রুহানকে দেখাল। তারপর সেই দূর্বাঘাসগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে বাদল ওর মুখে পুরতে লাগল। রুহান বলল, সেকি ভাই তুমি ছাগলের মতো ঘাস চিবাচ্ছো? আরে চিবাচ্ছি কী আর সাধে? এই থ্যাঁতলানো দূর্বাঘাস কিন্তু মহৌষধ। ক্ষতস্থানে লাগালেই রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়। আর ঘাও শুকিয়ে যায়। রুহান আমতা আমতা করে বলল, তাই বলে এই খেঁকশিয়ালের জন্য এত করার কী দরকার শুনি? ওরা তো আমাদের হাঁস-মুরগি, কবুতর সব ধরে ধরে খায়। হ্যাঁ তা অবশ্য খায় বৈকি! কিন্তু এই খেঁকশিয়ালটা সত্যি গুরুতর অসুস্থ। ওকে দেখে ভীষণ মায়া হচ্ছে আমার। দেখ দেখ আমাদের দিকে কেমন অসহায়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

রুহান দেখে বলল, সত্যি ওর এই অবস্থা দেখে খুব মায়া হচ্ছে। বাদল তারপর ওর মুখ থেকে থ্যাঁতলানো দূর্বাঘাসগুলো বের করে ওর গামছাতে রাখল। তারপর গামছার একটি অংশ এক টানে ছিঁড়ে ফেলল। রুহান বলল, এই নতুন গামছা তুই ছিঁড়ে ফেললি ভাই? কাকিমা কিন্তু ভীষণ বকবেন।

বাদল হেসে বলল, মা জানলে তো বকবে! আপাতত তুই কিছু বলিস না। তাতেই হবে।

বাদল বলল, তুই শিয়ালটাকে শক্ত করে ধর। যেন নড়াচড়া করতে না পারে। আর ওর নখের আঁচড়ে কিন্তু বিষ আছে। খেয়াল রাখিস! তা আর বলতে! রুহানের একটু ভয় ভয় করছিল তবু বুকে সাহস এনে শিয়ালটা ধরল। কিন্তু একি?

শিয়ালটা কোথায় শক্তি খাটিয়ে চলে যেতে চাইবে, তা না নেতিয়ে পড়ল মাটিতে? যেন সটান হয়ে শুয়ে পড়ল। রুহান বলল, সত্যি শিয়ালটা খুব অসহায় আর দুর্বল হয়ে পড়েছে। কদিন ধরে যে না খেয়ে আছে কে জানে? বাদল বলল ঠিক বলেছিস। বাদল থ্যাঁতলানো দূর্বাঘাসের রস শিয়ালের ক্ষতস্থানে আস্তে আস্তে লাগাচ্ছে। শিয়ালটি আস্তেস্বরে খ্যাক খ্যাক-খ্যাও খ্যাও করে উঠল। বাদল ক্ষতস্থানে দূর্বাঘাস লেপটে দিয়ে আস্তে করে ছেঁড়া গামছাটা দিয়ে বেঁধে দিল। বলল, শিয়ালটা সুস্থ হলে ওর দাঁত দিয়েই এটা খুলতে পারবে। এখন শিয়ালটাকে ছেড়ে দে! কাল আবার এসে দেখব ওর কী অবস্থা! এখন চল বাড়ি যাই।

রুহান বলল, আমার কাছে কিছু খাবার আছে ওকে খেতে দেই। খেতে দিবি? দে!

রুহান ওর সঙ্গে থাকা চিড়া-মুড়ি-খই শিয়ালটার মুখের কাছে রেখে দিল। বাদল বলল, সন্ধ্যা হয়ে গেছে প্রায়। চল এখন বাড়ি যাই। সন্ধ্যার আগেই আবার পড়তে বসতে হবে।

রুহান বলল, আচ্ছা ভাই একটা কথা বলত? তুই শিয়ালটা জন্য এত কিছু ক্যান করলি?

মানুষ তো শিয়াল দেখলেই মেরে ওদের পিটের চামড়া তুলে নেয়?

কেন করলাম শুনবি? হ্যাঁ বলো ভাই শুনি!

শোন, শিয়ালটাকে দেখেই আমার কেন যেন শিয়ালের গল্পগুলো মনে পড়ে গেল। ছোটবেলায় দাদা দাদির কাছে এই খেঁকশিয়ালের কত্ত গল্প শুনেছি। একবার ভেবে দেখ, যদি এই খেঁকশিয়ালগুলো না থাকত; তবে কী এত সুন্দর সুন্দর গল্প সৃষ্টি হতো। আমরা কী চালাক শিয়াল মামার নামটাও কোনো দিন পেতাম?

রুহান বলল, তাইতো? এটা তো ভেবে দেখেনি। সত্যি! এই শিয়াল মামার কাছ থেকে আমরা কতই না গল্প পেয়েছি। শিয়ালের গল্প থেকে মানুষও অনেক কিছুই শিখেছে। বাদল বলল, কাল আরেকবার শিয়ালটাকে দেখতে আসব কী বলিস! অবশ্যই ভাই! শিয়ালটার কী অবস্থা হলো তা দেখতেই হবে? তারপর ওরা কাশবন মাড়িয়ে জঙ্গল ভেদ করে বাড়ি চলে গেল।

পরদিনের কথা। ওরা আবার ডেরার কাছে এসে দেখে, কী আশ্চর্য! শিয়ালটি নেই। নেই মানে?

তাহলে কোথায় গেল? একটু দূরেই কিছুটা ফাঁকা জায়গা ছিল। রুহান বলল, ওই দেখ ভাই, শিয়ালটি ওখানে দিব্যি বসে আছে। বাদল তাকিয়ে দেখল, সত্যি তো! সেই কালকের শিয়ালটাই। পা গামছা বাঁধা রয়েছে। এখন শিয়ালটি সুস্থ! শিয়ালটি বাদল আর রুহানের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। শিয়ালটির অমন তাকানো দেখেই রুহান আর বাদল বুঝতে পারল, শিয়ালটি তার জীবন বাজানোর জন্য ধন্যবাদ দিচ্ছে। তারপর হঠাৎ কী মনে করে শিয়ালটি আনন্দে হুক্কা হুয়া বলে মারল এক লাফ! এক লাফেই চলে গেল পগার পার! রুহান আর বাদল দুজনই হেসে ফেলল। তবে দুজনই বেশ স্বস্তি¡ও পেল। মনে মনে ভাবল, যাক! শিয়ালটিকে তারা শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পেরেছে!

 

"