শাপলা-শালুক

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

ফারুক হোসেন সজীব

চারদিকে বর্ষার পানি থৈ থৈ করছে। যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। কিন্তু কোথাও কোনো শাপলা-শালুক নেই। রিয়া শহর থেকে মামাবাড়িতে বেড়াতে এসেছে। শাপলা-শালুক দেখবে বলে। এ জন্য সে মামাতো ভাই রায়হানের সঙ্গে নৌকায় এখানে-ওখানে ঘুরছে। কিন্তু কোথাও সে শাপল ফুল দেখতে পাচ্ছে না। যতদূর চোখ যাচ্ছে শুধু পানি আর পানি। রিয়া রায়হান ভাইয়াকে বলল, ভাইয়া কোথাও তো শাপলা ফুল দেখতে পাচ্ছি না! তুমি আমাকে এ কোথায় নিয়ে এলে? শুনে রায়হান বলল, সত্যি বোন, ভীষণ দুঃখিত আমি! কারণ এখন বিলে-ঝিলে তেমন একটা শাপলা-শালুক দেখা যায় না।

শুনে রিয়া অবাক হয়ে বলল, কেন দেখা যায় না ভাইয়া? তার মানে আমি কী শাপলা-শালুক দেখতে পাব না? বর্ষার পানিতেই তো শাপলা-শালুক হয়!

হ্যাঁ ঠিক বলেছ বোন। বর্ষার পানিতেই শাপলা-শালুক হয় কিন্তু...?

কিন্তু কী ভাইয়া? রিয়া বেশ উৎসুক মনে জানতে চাইল। রায়হান আমতা আমতা করে বলল, আসলে এখন তো সবাই ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করে, তাই জমিতে তেমন একটা শাপলা-শালুক হয় না! আর সব জমিতেই এখন রাসায়নিক সার ব্যবহার করে। এজন্য জমিতে অবাঞ্ছিত ঘাসও আর জন্মে না। জমির মাটিও আর উর্বর হয় না! কিন্তু ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করলে শাপলা-শালুক হবে না কেন ভাইয়া? বিষয়টি আমাকে খুলে বলে তো!

রায়হান বলল, ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করলে শাপলা-শালুকের যে অবশিষ্ট কান্ডগুলো মাটিতে থাকে, তা সব উপড়ে ওঠে। তারপর গ্রীষ্মের প্রচন্ড রোদ-খরতাপে সেগুলোর কান্ডগুলোও পুড়ে মরে যায়। এজন্য বর্ষার পানিতে আজকাল আর তেমন একটা শাপলা-শালুক দেখা যায় না।

রায়হানের কথাটি শুনে রিয়া ভীষণ অবাক হয়ে গেল। রিয়া আফসোস করে বলল, তার মানে আমি শাপলা-শালুক দেখতে পাব না? কত শখ করে গ্রামে এসেছি। শাপলা-শালুক দেখব বলে। বিল থেকে শাপলা তুলে সেগুলোর মালা গেঁথে আমার মাথায় পরব! আর শাপলার কান্ড, ফুল তেঁতুল দিয়ে মাখিয়ে বেশ মজা করে খাব! কিন্তু আমার সেই শখ বুঝি আর পূর্ণ হলো না!

রায়হান দেখল, রিয়া ভীষণ মন খারাপ করে নৌকার গোলইয়ে ওপর চুপচাপ বসে আছে। কোনো কথাই আর বলছে না। রায়হান ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল। কী করা যায় ভাবতে লাগল। হঠাৎ রায়হান বলল, রিয়া বোন আমার, তুমি মন খারাপ করো না। আমি তোমাকে যখন কথা দিয়েছি শাপলা-শালুক দেখাব, তখন যে করেই হোক দেখাব। এই বলে রায়হান পুবের দিকে নৌকা বাইতে লাগল। রিয়া বলল, তুমি কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ভাইয়া? ওদিকে তো শুধু কাশফুল আর কাশফুল।

রায়হান বলল, ওদিকের জমিগুলো খুব ছোট ছোট। আল দিয়ে বাঁধা। আর জমির মালিকরাও ভীষণ গরিব। ওরা ইচ্ছে করলেই খেতে ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করতে পারে না। আমি সিওর! ওদিকে গেলে তোমাকে নিশ্চয় শাপলা-শালুক তুলে এনে দেখাতে পারব। শুনে রিয়া ভীষণ খুশি হলো। সে রায়হান ভাইয়াকে বলল, তাহলে তাড়াতাড়ি চলো ভাইয়া। আমার যে শাপলা-শালুক অবশ্যই চাই-চাই। আমি কিছু শাপলা-শালুক শহরেও নিয়ে যাব। আমার অনেক বন্ধুরা আছে। ওরা তো শুধু টিভিতে আর পত্রপত্রিকায় শাপলা-শালুক দেখেছে। কিন্তু কোনো দিন বাস্তবে দেখেনি। আমি ওদের সবাইকে দেখাব। রায়হান কৌতূহলী হয়ে বলল, হঠাৎ তোমার বন্ধুরা এত ফুল, ফল থাকতে শাপলা-শালুক কেন দেখছে চাইছে, বলো তো রিয়া?

রিয়া রায়হান ভাইয়ার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, সেকি! তুমি জানো না বুঝি? শাপলাফুল আমাদের জাতীয় ফুল! আর আমাদের জাতীয় ফুল আমরা দেখব না? তা কী করে হয়?

রায়হান রিয়ার কথার যুক্তি খুঁজে পেল। মনে মনে ভাবল, সত্যিই তো! আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা। এই ফুল সবার দেখা দরকার। অনেকেই শাপলা ফুলের মতো দেখতে নৌকোফুল দেখে ভাবে, এটাই বুঝি শাপলা ফুল! অনেকে আবার পদ্মফুলকে দেখে বলে শাপলা ফুল। এটা তাদের ভুল ধারণা। রায়হান মনে মনে চিন্তা করল, আজ সে অনেক শাপলাফুল আর পানির নিচ থাকা শালুক তুলে রিয়াকে দেখাবে। রিয়া সেগুলো ওর বন্ধুদেরও দেখাতে পারবে। দেখলে ওরাও ভীষণ খুশি হবে। প্রকৃত শাপলা ফুল দেখতে কেমন হয়। ওরাও জানতে পারবে, চিনতে পারবে।

রায়হান জোরে জোরে বৈঠা চালাতে লাগল। মুহূর্তেই ওরা পৌঁছে গেল ঘন কাশফুলের আড়ালে। কিন্তু একি! কাশফুলের আড়ালে এত্ত শাপলাফুল ফুটে আছে? রায়হান যেন জানতই না। এক সঙ্গে এত এত শাপলাফুল দেখে রিয়ার চোখ তো ছানাবড়া হয়ে গেল। রিয়া ভীষণ এক্সসাইটেড হয়ে পড়ল। রিয়া এক্ষুনি পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার প্রস্তুতি নিল। রায়হান বলল, সাবধান রিয়া! তুমি চুপচাপ বসে থাক। আমি তোমাকে শাপলা-শালুক তুলে এনে দিচ্ছি। এখানে অনেক পানি। আর শাপলা-শালুকের আশপাশে সাপও থাকতে পারে। সাপের কথা শুনে রিয়া ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে রইল। রায়হান এক ঝাঁপ দিয়ে পানিতে নামল। তারপর পানিতে এক ডুব দিয়ে অনেক নিচে চলে গেল। তারপর শাপলাফুল এবং কালো কালো শালুক তুলে এনে রিয়ার হাতে দিল। এভাবে প্রায় আধাঘণ্টার মধ্যে রায়হান অনেক শাপলাফুল আর শালুক তুলে আনল। রিয়া দেখল, রায়হান ভাইয়া ডুব দিয়ে পানির নিচে চলে যাচ্ছে। আর শাপলা-শালুক তুলে আনছে। এজন্য রায়হান ভাইয়ার চোখ দুটিও ভীষণ লাল হয়ে গেছে। রিয়া বলল, অনেক হয়েছে ভাইয়া। তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না। আমার এগুলোতেই চলবে। রায়হান তারপর পানি থেকে উঠে এলো।

রিয়া এত এত শাপলাফুল আর শালুক দেখে ভীষণ অবাক হয়ে গেল। রিয়া শাপলাফুলের কান্ডগুলো আস্তে আস্তে ছিঁলে মুখে পুরছে। আর চোখ বন্ধ করে বলছে, সত্যি ভাইয়া খেতে দারুণ মজা! রায়হান রিয়ার কান্ডকারখানা দেখে মিটমিট হাসছে। তারপর রায়হান আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে নৌকা বাইতে শুরু করল। রায়হান দেখল, রিয়া গভীর মনোযোগ দিয়ে শাপলাফুলের মালা গাঁথছে! আর গুনগুন করে গান গাইছে। রিয়ার হাসিখুশি মুখটা দেখে রায়হানেরও ভীষণ ভালো লাগছে! রায়হান মনে মনে স্বস্তি পাচ্ছে, নিজেকে সান্ত¡না দিচ্ছে যাক্! ছোট বোনটিকে, সে সত্যিকারের শাপলা-শালুক দেখাতে পেরেছে! এটাই তার সার্থকতা!

 

"